04/09/2026
মথুরার সেই রাতটা ছিল ভীষণ অন্ধকার।
আকাশে মেঘ, বাইরে ঝড়-বৃষ্টি, আর চারদিকে এক অদ্ভুত ভয়।
কারাগারের ছোট্ট সেই ঘরে দেবকী অপেক্ষা করছিলেন তাঁর অষ্টম সন্তানের জন্য। আগের সন্তানদের একে একে হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়েও একজন মা তাঁর সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।
অবশেষে সেই রাতেই জন্ম নিলেন কৃষ্ণ।
কিন্তু জন্মের আনন্দটুকুও যেন ভাগ্যে লেখা ছিল না।
বাসুদেব জানতেন, এই শিশুকে বাঁচাতে হলে তাঁকে এখনই গোকুলে পৌঁছে দিতে হবে।
তাই গভীর রাতের অন্ধকারে, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে, নিজের শিশুকে বুকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
পথে ছিল উত্তাল যমুনা।
একদিকে ভয়, অন্যদিকে সদ্যোজাত সন্তানকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ।
কিন্তু সেই রাত যেন নিজেই পথ করে দিয়েছিল।
যমুনা পার হয়ে ছোট্ট কৃষ্ণ পৌঁছলেন গোকুলে—যশোদার ঘরে।
সেখান থেকেই শুরু হলো তাঁর সেই শৈশব, যে শৈশবের গল্প আজও আমাদের ঘরে ঘরে বেঁচে আছে।
মথুরার রাজপরিবারে জন্মানো সেই শিশু গোকুলে হয়ে উঠলেন সবার আদরের কানাই।
কখনও বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছেন,
কখনও গরুর পেছনে পেছনে হাঁটছেন,
কখনও গোপালদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠছেন।
আর মাখন?
মাখনের হাঁড়ি দেখলেই তো কানাইয়ের চোখ চকচক করে উঠত!
ঘরের উঁচু তাকে তুলে রাখা মাখনের হাঁড়ি তাঁর হাত থেকে বাঁচত না। কখনও একা, কখনও বন্ধুদের নিয়ে—কীভাবে যেন ঠিক পৌঁছে যেতেন সেখানে।
তারপর মাখন খেয়ে মুখে এমন নিষ্পাপ ভাব করতেন, যেন কিছুই জানেন না!
যশোদা কখনও রাগ করতেন, কখনও বকতেন।
কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও ছিল মায়া।
কারণ কানাই যতই দুষ্টুমি করুন, যশোদার চোখে তিনি তো তাঁর ছোট্ট সন্তানই।
একদিন সেই ছোট্ট কানাইকে নিয়ে ঘটল এমন এক ঘটনা, যা কোনও মা কখনও কল্পনাও করতে পারেন না।
যশোদা কৃষ্ণকে ব্রহ্মাণ্ডঘাটে বসিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অন্য কাজে গিয়েছিলেন।
ফিরে এসে দেখলেন, কৃষ্ণ মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে মুখে দিচ্ছেন।
মায়ের চোখে পড়তেই তিনি ছুটে এলেন।
“মাটি খেয়েছিস?”
কৃষ্ণ মাথা নেড়ে বললেন, “না।”
বন্ধুরাও নাকি বলছে, কৃষ্ণ মাটি খেয়েছেন।
যশোদা এবার বললেন,
“মুখ খোল তো দেখি।”
ছোট্ট কৃষ্ণ মায়ের কথা মতো মুখ খুললেন।
আর তারপর—
যশোদার চোখের সামনে যা দেখা গেল, তা কোনও মায়ের চোখে দেখার মতো দৃশ্য নয়।
সেই ছোট্ট মুখের ভিতর তিনি দেখতে পেলেন আকাশ, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র, পৃথিবী।
আর সেই পৃথিবীর মধ্যেই আবার গোকুল, নন্দের বাড়ি, যশোদা নিজে এবং তাঁর কোলে থাকা ছোট্ট কৃষ্ণ।
মুহূর্তের জন্য যশোদা যেন বুঝতেই পারলেন না—
তিনি কি তাঁর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন,
নাকি সমগ্র সৃষ্টির দিকে?
যে শিশুকে একটু আগেই মাটি খাওয়ার জন্য বকছিলেন,
তার ছোট্ট মুখের ভিতরেই যে এত বড় এক পৃথিবী লুকিয়ে আছে!
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল—
সেই বিস্ময়ের পরেও যশোদার কাছে কৃষ্ণ বদলে গেলেন না।
তিনি আবার সেই ছোট্ট কানাই।
যে দুষ্টুমি করে।
যে মায়ের কাছে বকুনি খায়।
যে মায়ের হাত ধরে হাঁটে।
যে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
হয়তো এটাই মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে আশ্চর্য দিক।
পৃথিবী যাকে ভগবান বলে জানে,
মায়ের কাছে সে-ই তাঁর সন্তান।
যার মুখে পুরো ব্রহ্মাণ্ড দেখা যায়,
মায়ের চোখে সে-ই সেই ছোট্ট ছেলে—যাকে একটু আগে মাটি খাওয়ার জন্য বকতে হয়েছিল।
কৃষ্ণের শৈশবের গল্প তাই শুধু অলৌকিকতার গল্প নয়।
এ গল্প একজন মায়েরও।
এ গল্প সেই ভালোবাসার, যেখানে ঈশ্বরও সন্তানের রূপ নিয়ে মায়ের কাছে ধরা দেন।
তাই তো জন্মাষ্টমী এলেই আমাদের ঘরগুলোতেও যেন সেই গোকুলের আবহ তৈরি হয়।
ছোট্ট গোপালের জন্য নতুন পোশাক বের হয়।
মুকুট সাজানো হয়।
ফুল দিয়ে একটা ছোট্ট জায়গা সাজানো হয়।
কেউ নিজের হাতে মাখন-মিছরি সাজিয়ে রাখেন, কেউ ছোট্ট পায়ের ছাপ এঁকে দেন ঘরের মেঝেতে।
বাড়ির ব্যস্ততার মধ্যেও সেই ছোট্ট আয়োজনটার জন্য সবাই একটু সময় বের করে নেন।
কারণ কৃষ্ণকে আমরা শুধু দূরের কোনও দেবতা হিসেবে দেখি না।
তিনি আমাদের ঘরেরও একজন।
কখনও ছোট্ট কানাই,
কখনও গোপাল,
কখনও মায়ের আদরের লাড্ডু গোপাল।
হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও তাই কৃষ্ণের শৈশব আমাদের এত আপন লাগে।
হয়তো কারণ, কৃষ্ণের গল্পে আমরা ঈশ্বরকে যতটা খুঁজি, তার থেকেও বেশি খুঁজি একটা শিশুকে ঘিরে থাকা ভালোবাসা।
সেই ভালোবাসা, যা একটা ঘরকে শুধু থাকার জায়গা করে রাখে না—
তাকে স্মৃতির জায়গা করে তোলে।
আজ জন্মাষ্টমীর দিনে তাই মনে হয়—
যে শিশুর মুখের ভিতর পুরো ব্রহ্মাণ্ড ছিল,
সে-ই তো আমাদের শিখিয়ে গেছে—
ভালোবাসার কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ও কখনও কখনও খুব ছোট্ট হয়ে যায়।
শুভ জন্মাষ্টমী। 💙🦚