03/07/2024
" এই যে, শুনছো।ছেলেটা, তোমার মা' র বাংলা কথাবার্তা শুনে শুনে একেবারে বাংলা মিডিয়াম ছেলেদের মত হয়ে যাচ্ছে।মুখে শুধু বাংলা কথা, আর বাংলা কথা।এই দেখো না, আমি যতবার বলছি,এটা MANGO, ছেলে ততবার বলছে এটা আম।"
স্ত্রী অর্নার কথা শুনে স্বামী বিজয় বললেন,-"এভাবে তো ছেলে কখনো শিখবে না।
তোমাকে বলতে হোত, -' অনি, এটা আম-আর আমকে ইংরেজিতে বলে MANGO।"
ব্যবহারিক স্বরটি বিদ্যুৎ বেগে পাল্টিয়ে, অর্না বলল, - "হয়েছে, হয়েছে, অ..নে..ক... হ..য়ে..ছে...। নতুন করে আর আমাকে শিখাতে হবে না। কীভাবে বলতে হয়- আমার সেটা জানা আছে।আমার হয়েছে জ্বালা! বরঞ্চ আমরা এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও ভাড়া চলে গেলেই ভালো।ছেলেটাকে তো মানুষ করতে হবে।এই বাড়িতে থাকলে,তোমার মা'র এইরকম বস্তির কথাবার্তায় একসময় ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাবে।"
অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বিজয়। মা'র বিষয়ে,অর্না'র কাছ থেকে এই ধরনের কথাগুলো শুনতে শুনতে ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে একটা সময় গর্জে উঠলেন - "এই তোমার চিন্তা ভাবনা!মা'র আদবকায়দায় আমার ছেলে খারাপ হবে! - এটা তুমি, ঠিক বললে না ,অর্না। চিন্তাভাবনা করে কথা বলছো তো? তুমি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে - তোমার 'Maternity leave' শেষের পর থেকেই তো, মা-ই অনি কে এতটা বড় করেছে। একটু বড় হতে, না হতেই বলছো,ওই মা-ই আমার ছেলেকে নষ্ট করে ফেলছে।"
অনি তাদের একমাত্র ছেলে।বয়স চা'রে পড়লো।সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
বিজয় বললেন,-" আমার মা, দীর্ঘবছর ধরে হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে সুশিক্ষায় মানুষ করেছেন ।তারা অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত।"
স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন, বিজয় এর মা। গত চার বছর হয়েছে অবসর নিয়েছেন ।এখন নাতিকে নিয়েই অবসর সময় কাটে তার।
অর্না বলল,-" হ্যাঁ, আমি জানতাম, আমার কথা শোনার পর তুমি ওরকম একটা React করবে। সাধে, তুমি আমার কথা শুনবে।"
বিজয় একটু উঁচু স্বরে বললেন,-"শুনবো, অবশ্যই শুনবো, যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়। যদি সেটা Scientific হয়।"-
এমন সময় অর্নার ফোনটি বেজে ওঠল।
মা'র ফোন-"কী রে , ফোন করেছিলি বলে?"
"হ্যাঁ, বৌমনি ধরেছিল। তুমি বাড়ি ছিলে না।"
"আরে, ওই শ্যামল এর বাড়িতে গেছিলাম। কয়েকদিন আগেই শুনেছি , শ্যামল এর মা কল-পারে পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে। তাই আজকে দেখতে গেছিলাম। চিনতে পারলি তো, শ্যামল কে। তোরই স্কুল জীবনের বন্ধু ।
কল-পারে, পড়ে যাওয়া ছাড়া,এতদিন আমি আর কিছুই শুনি নাই। আজকে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে আমি অবাক হয়ে গেছি।
শ্যামল, তার বৃদ্ধা মাকে বাড়িতে একলা ফেলে, ছেলে-বউ নিয়ে অন্য কোথাও ভাড়া থাকে। এই বয়সে শ্যামল এর মা এত বড় বাড়িতে একা। কী রান্না করে, কী খায়- তা আমি কিছুক্ষণের কথাতেই বুঝেছি।
খুব দুঃখ করে আমাকে বলল,-'ছেলেটাকে কত কষ্ট করে মানুষ করেছি। ওর বাবা চলে যাওয়ার পর আমাদের খাওয়া-দাওয়ার খুবই কষ্ট হয়েছিল। আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে খাইয়েছি। পড়াশোনা শিখিয়েছি- বয়সকালে একটু সুখ পাব বলে। ছেলে চাকরি পেল। বিয়ে দিলাম। একটা সন্তানও হল তাদের। এখন নাতিকে নিয়ে নানা গল্প করে, কষ্টকে ভুলে গিয়ে- আনন্দে থাকার কথা ছিল। কিন্তু, সেটা আর হলো কই!! '
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,বলতে বলতে কেঁদে ফেলল। সেখানে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া আর আমার কিছুই ছিল না।"
এতক্ষণ ধরে একটি কথাও বলেনি, অর্না।
মা'র ফোনের কথাগুলো অর্নার অন্তস্থলকে জাগিয়ে তুলছিল। তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে- ধীরে ধীরে।
"শ্যামল তো ওরকম ছেলে নয়, যে- মাকে ছেড়ে চলে যাবে?"- অর্না'র কথা টেনে মা বলল,-"আমারও তো সেই প্রশ্ন।ছেলেটা তো ভালো। কিন্তু বিয়ের পর নাকি বউয়ের কথায় উঠতো, আর বউয়ের কথায় বসতো। নিজস্ব চিন্তাশক্তি বলতে কিছু ছিল না, সব হারিয়ে ফেলেছিল সে। যাওয়ার সময় নাকি বলেছে , ছেলের পড়াশোনা এখানে হচ্ছে না, তাই শহরে ভাড়া বাড়িতে যাচ্ছে। আসলে বউ শাশুড়িকে নিয়ে সংসার করবে না।তাই ছেলের পড়াশুনার অজুহাত দেখিয়ে, শহরে বাড়ি ভাড়া করে থাকার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করেছে।
আমরা শাশুড়িকে নিয়ে সংসার করিনি। তুই তো তোর ঠাকুমা'র কাছেই মানুষ। আমি তো সেই সকাল হলেই নাকে - মুখে একটু খেয়ে চলে যেতাম অফিস। কোন কোনদিন ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। ততক্ষণ তোর ঠাকুমা সংসারের সব কাজের সাথে সাথে তোকে খাওয়ানো, ঘুমানো এমনকি বই পড়ানো সবই করাত।
বাড়িতে এক বয়স্কা মহিলার যে কত ভূমিকা থাকে, তা আমি ভালোভাবেই বুঝেছিলাম।"
"বৌমা, ও বৌমা" ডাকে শাশুড়িকে এগিয়ে আসতে দেখে অর্না,তার মাকে ফোনটা রাখতে বললো।
নরম সুরে শাশুড়িকে বলল,- "বলো...।"
"বৌমা, আজকে তোমার মাসি শাশুড়ির বাড়িতে তার মেয়ের আইবুড়ো ভাত। সবাইকে যেতে বলেছে।"
"কিন্তু মা, অনির যে আজ শরীরটা ভালো নেই। গা- টা গরম গরম ভাব। কীভাবে যাব?"
"কীভাবে যাব মানে?"আমি কিসের জন্য আছি। অনিকে আমার কাছে রেখে, তোমরা দু'জনে চলে যাও। আমি অনিকে দেখব, আমি তাকে খাবার তৈরি করে দেবো।"
অর্নার ভিতরের ব্যতিক্রমী ভাবনাগুলো যেন আস্তে আস্তে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। আর সেই ভাঙা অংশের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, শুভ্র-শীতল স্বচ্ছ ভাবধারা।
"মা, অনির এই ওষুধটা তুমি কাছে রাখো, যদি গা-টা বেশি গরম মনে হয়, তাহলে দুই চামচ খাইয়ে দিও।আমরা দেরি করবো না, তাড়াতাড়ি ব্যাক করব।"
নেমন্তন্ন বাড়ি যেতে যেতে , বিজয় কে বলল অর্না,-"আজকের কথাগুলোতে তুমি রাগ করো না। যা বলেছি, সেটা ভুলে যাও।"
"কোন রহস্যের প্রতিফলন-এটা।আমাকে বলতেই হবে। আজকেই বলবে তো?"
"না, বলবো না....রহস্যটা থাক, রহস্য হয়েই।তুমি সোজা গাড়ি চালাও।" আদুরে গলায় শব্দগুলো বলতে বলতে অর্না , তার ডান হাতটা বিজয় এর ঘাড়ে রাখল। একটা 'শান্তি'র আভাস পাচ্ছেন বিজয়।
মোটরসাইকেলটি এবড়ো-খেবড়ো, উঁচু-নিচু রাস্তা দিয়ে মধ্যগতিতে এগিয়ে চলল......।
শ্বাশুড়ি মা
মৌসুমি ঘোষ