05/29/2026
২১.৫ মিলিয়ন ক্ষতিপূরণ দিতে টরন্টোর
প্লাস্টিক সার্জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়
টরন্টোর একজন সুপরিচিত প্লাস্টিক সার্জনের বিরুদ্ধে রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে ২১.৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২১৫ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ওই চিকিৎসক তার ক্লিনিকের বিভিন্ন স্থানে ২৪টি গোপন ও প্রকাশ্য নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন, যার মধ্যে এমন কিছু সংবেদনশীল স্থানও ছিল যেখানে রোগীদের গোপনীয়তা রক্ষার পূর্ণ অধিকার ছিল।
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই চিকিৎসকের নাম Dr. Martin Jugenburg, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “Dr. 6ix” নামে ব্যাপক পরিচিত। তিনি টরন্টোর ডাউনটাউনের ঐতিহাসিক ফেয়ারমন্ট রয়েল ইয়র্ক হোটেলে অবস্থিত 'টরন্টো কসমেটিকস সার্জারি ইন্সটিটিউট' পরিচালনা করেন। তার ক্লিনিকে ব্রেস্ট অগমেন্টেশন, লিপোসাকশন, টামি টাক, বোটক্স ও বাট লিফটসহ বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক সার্জারি করা হতো।
প্রায় ৭,০০০ সাবেক রোগীর পক্ষে দায়ের করা একটি যৌথ মামলা বা Class Action Lawsuit-এর প্রেক্ষিতে আদালত এই রায় প্রদান করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: "আস্থার চরম অপব্যবহার"
মামলার শুনানি ও প্রমাণ পর্যালোচনার পর জাস্টিস পল শ্যাব্যাস (Justice Paul Schabas) তার রায়ে চিকিৎসকের এই আচরণকে “নিন্দনীয়” বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসক তার রোগীদের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সঙ্গে তার যে আস্থার সম্পর্ক ছিল, তিনি সেই পবিত্র সম্পর্কের চরম অপব্যবহার করেছেন। রোগীরা চিকিৎসা গ্রহণের সময় চিকিৎসকের ওপর যে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন, তা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।"
কীভাবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে?
২০১৮ সালে কানাডার খ্যাতনামা গণমাধ্যম CBC-এর অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান Marketplace-এর একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই ঘটনা জনসমক্ষে আসে। প্রতিবেদনে ক্লিনিকের ভেতরে স্থাপিত ক্যামেরা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর 'কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব অন্টারিও' (CPSO) বিষয়টি তদন্ত করে এবং ক্লিনিকে স্থাপিত ক্যামেরাগুলো নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেয়।
কোথায় কোথায় ছিল এই ২৪টি ক্যামেরা?
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ক্লিনিকের প্রায় প্রতিটি কোণায় ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো:
রিসেপশন এরিয়া (Reception Area)
ওয়েটিং রুম (Waiting Room)
হলওয়ে বা করিডোর (Hallway)
স্টাফ রুম ও ওয়ার্কপ্লেস এরিয়া (Staff Room & Workplace)
কনসালটেশন রুম (Consultation Room)
ইনজেকশন রুম (Injection Room)
অপারেশন থিয়েটার (Operating Room)
পোস্ট-অপারেটিভ রিকভারি এরিয়া (Post-Operative Recovery Area)
বিচারক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, কনসালটেশন, ইনজেকশন বা অপারেশন কক্ষের মতো স্থানগুলোতে রোগীদের পোশাক খুলতে হতো এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে শরীরের ব্যক্তিগত অংশ উন্মুক্ত করতে হতো—সেখানেও ক্যামেরা সচল ছিল।
রোগীদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে, অধিকাংশ রোগীই এই ক্যামেরাগুলোর উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। তদন্তে দেখা যায়, ক্লিনিকের ভেতরে নজরদারি সংক্রান্ত একটি সতর্কীকরণ নোটিশ ছিল, তবে তা অপারেশন কক্ষের একটি তাকের ওপর এমনভাবে রাখা ছিল যা সহজে কারও চোখে পড়ত না। এছাড়া কনসালটেশন বা এক্সামিনেশন রুমের মতো সংবেদনশীল জায়গায় কোনো ধরনের সতর্কীকরণ নোটিশ ছিল না। রোগীদের মুখে বা লিখিতভাবেও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
"আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত"
পাঁচ সপ্তাহব্যাপী শুনানিতে ১২ জন ভুক্তভোগী রোগী আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ১১ জনই জানান, পরীক্ষা ও পরামর্শের সময় তাদের শরীরের পোশাক সম্পূর্ণ বা আংশিক খুলতে হয়েছিল। ২০১৮ সালে মিডিয়ার রিপোর্টের আগে তারা জানতেনই না যে তাদের সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় রেকর্ড হচ্ছিল।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় রোগীরা জানান, বিষয়টি জানার পর তারা নিজেদের:
লঙ্ঘিত (Violated)
অপমানিত (Humiliated)
হতবাক (Shocked)
প্রতারিত (Betrayed) এবং
মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত (Distressed) মনে করছেন।
অনেকে জানান, এই ঘটনার পর থেকে চিকিৎসকদের প্রতি তাদের চিরদিনের মতো আস্থা উঠে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচারণার লোভ
শুনানিতে আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় উঠে আসে, তা হলো Social Media Consent বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি/ভিডিও প্রকাশের সম্মতি।
আদালত দেখেছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার রেকর্ডিংয়ের জন্য রোগীদের কোনো অনুমতি নেওয়া না হলেও, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের জন্য রোগীদের সম্মতি আদায়ে ব্যাপক জোর দেওয়া হতো। কয়েকজন রোগী জানান, অস্ত্রোপচারের ঠিক আগে তাদের ওপর 'সোশ্যাল মিডিয়া কনসেন্ট ফর্ম'-এ স্বাক্ষর করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো, যাতে তাদের অস্ত্রোপচারের আগের ও পরের (Before and After) ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ক্লিপ বা রিলস হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
বিচারক শ্যাব্যাস পরিষ্কার বলেন, এই চিকিৎসকের মূল লক্ষ্য ছিল ক্যামেরা ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নিজের ক্লিনিকের বিপণন ও প্রচারণা চালানো।
চিকিৎসকের দাবি ও আদালতের সিদ্ধান্ত: আদালতে ড. মার্টিন জাজেনবার্গ দাবি করেন, ক্যামেরাগুলো শুধুমাত্র 'নিরাপত্তার স্বার্থে' স্থাপন করা হয়েছিল এবং সেগুলো লুকানো ছিল না।
তবে বিচারক এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি পরবর্তীতে নিজের অপরাধ ঢাকার একটি অজুহাত মাত্র। অবশ্য আদালত স্বস্তির খাতিরে এটিও উল্লেখ করেছে যে, এই ক্যামেরাগুলো কোনো যৌন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বা ভিডিও ফুটেজ অবৈধভাবে অন্য কোথাও পাচার করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
একটি ঐতিহাসিক নজির: কানাডার আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়টি দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি আগামী দিনে রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা, চিকিৎসা নৈতিকতা (Medical Ethics) এবং যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি ক্যামেরা ব্যবহারের আইনি সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর নজির (Precedent) হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র: সিটিভি নিউজ (CTV News)