Unique Shop BD

Unique Shop BD Online Shopping Center

19/08/2022

হুমায়ূন আহমেদ -হিমু সমগ্র
(আঙুল কাটা জগলু part- 04)

জগলু ভাই আমার পেছনে পেছনে আসছেন। কালো চশমায় তাকে অন্ধ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীর মত লাগছে। তবে এই রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী অস্থির প্রকৃতির। সারাক্ষণই এদিক-ওদিক দেখছেন। খুট করে সামান্য কোনো শব্দ হল— সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে তাকালেন। এই অবস্থা। একটু পরপর আকাশের দিকেও তাকাচ্ছেন। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। আমাদের রিকশা নেয়া উচিত ছিল। জগলু ভাই রিকশা নেবেন না। যে গাড়িতে করে এসেছেন সেই গাড়িও গলির ভেতর ঢুকাবেন না। তার নাকি সমস্যা আছে।

কলাবাগানের গলিতে যখন ঢুকছি। তখন পটকা-ফাটা কিংবা রিকশার টায়ার-ফাটা শব্দ হল। জগন্দু ভাই লাফিয়ে উঠলেন। বডিগার্ড ধরনের যে দুজন তার সঙ্গে ছিল তারা এখনও আছে। বডিগার্ড দুজনের একজন বোকা টাইপ চেহারার। সে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে। কোন কিছুতেই বিচলিত হয় না। আরেকজন জগলু ভাইয়ের চেয়েও অস্থির। সে কিছুক্ষণ পরপর দাঁড়িয়ে পড়ে এবং পেছন দিকে তাকায়। তার মনে হয় ঘাম রোগ আছে। কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছেই। যখন সে দাঁড়িয়ে যায়। তখন রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে।

জগলু ভাই বললেন, তুমি কার বাসায় যাচ্ছ?

আমি বললাম, শুভ্রর বাসায় যাচ্ছি।

শুভ্ৰ কে?

আমার অতি ঘনিষ্ট এক বন্ধু। তার সঙ্গে দুই মিনিট কথা বলব।

আপনি ইচ্ছা করলে বাড়ির সামনে দাঁড়াতে পারেন। কিংবা আমার সঙ্গে বাড়িতে ঢুকতেও পারেন।

আমি বাইরে দাঁড়াব। তুমি দুই মিনিটের বেশি এক সেকেন্ড দেরী করবে না। তোমার বন্ধুর সঙ্গে আজ দেখা না করলে হয় না।

খুবই জরুরি দরকার। সে আমাকে একটা ধাঁধা দিয়েছিল। ধাঁধার উত্তর বের করেছি। তাকে সেটা জানানো দরকার।

কী ধাঁধা?

এমন কি বস্তু যার জীবন আছে কিন্তু সে খাদ্য গ্ৰহণ করে না! যে সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু সস্তানকে চোখে দেখে না!

এমন কিছু কি আছে?

অবশ্যই আছে।

সেটা কী?

চিন্তা করে বের করুন এটা কি!

আবার বলো তো–

এমন কি বস্তু যার জীবন আছে কিন্তু সে খাদ্য গ্ৰহণ করে না! যে সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু সন্তানকে চোখে দেখে না!

ভাল যন্ত্রণা তো! জটিল ধাঁধা।

জটিল ধাঁধার উত্তর সহজ হয়। আপনি সহজভাবে চিন্তা করুন। জটিলভাবে করবেন না।

বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। বড় বড় ফোটা। লক্ষণ ভাল না। ঝুম বৃষ্টির পূর্বাভাস। শুভ্রদের বাড়ির গেট পর্যন্ত আসতেই ঝুম বর্ষণ শুরু হল। আমি জগলু ভাইকে নিয়েই বাড়িতে ঢুকলাম। বাড়ি বলা ঠিক হয় না। টিনের ছাউনি। ছাউনির ভেতর সিমেন্টর বস্তা, রড রাখা। তার ফাকে বড় চৌকি পাতা। চৌকির উপর বসে যে লেখাপড়া করছে তার নামই শুভ্র।

শুভ্রর বয়স দশ। রাজপুত্রদের চেহারার যে বর্ণনা পাওয়া যায়— সে রকমই তার চেহারা। বড় বড় চোখ। চোখে বুদ্ধি ঝলমল করছে। শুভ্রর বাবা জায়গাটার কেয়ারটেকার। এখানে যে বহুতলা ফ্ল্যাটবাড়ি হবে তিনিই সেটা দেখাশোনা করছেন। জগলু ভাই বললেন, এই ছেলে কে?

আমি বললাম শুভ্র। আমার বন্ধু। এই পৃথিবীর দশজন সেরা বুদ্ধিমান বালকদের একজন।

কার ছেলে?

যার ছেলে তার নাম নেয়ামত। এই পৃথিবীর দশজন সৎ মানুষদের তিনি একজন।

এর সঙ্গে পরিচয় হল কিভাবে?

আপনার সঙ্গে যেভাবে পরিচয় হয়েছে নেয়ামত ভাইয়ের সঙ্গেও একইভাবে পরিচয় হয়েছে। হঠাৎ দেখা। হঠাৎ পরিচয়।

জগলু ভাই চোখ থেকে চশমা খুলেছেন। তাঁর দৃষ্টি শুভ্রর দিকে। সেই দৃষ্টিতে আগ্রহ এবং কৌতূহল। আমি বললাম, এই তোর বাবা কই?

শুভ্ৰ আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, চিটাগাং।

যতবারই শুভ্ৰকে দেখতে এসেছি ততবারই সে প্রথম কিছুক্ষণ এমন ভাব করেছে যে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। কথা বলে অন্য দিকে তাকিয়ে। কথা বলার ভঙ্গিটা— অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলছে।

চিটাগাং কবে গিয়েছে?

গতকাল।

তোকে ফেলে রেখে চলে গেছে?

শুভ্ৰ জবাব দিল না।

রাতে এখানে একা ছিলি?

হুঁ।

ভয় পেয়েছিলি?

হুঁ।

আজ রাতেও একা থাকিবি?

হুঁ।

ভয় পাবি না?

পাব।

মাঝে মাঝে ভয় পাওয়া ভাল। ভয় পেলে শরীরের সব যন্ত্রপাতি ঝাকুনির মত খায়। শরীর ভাল থাকে। যারা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে তাদের শরীর ভাল থাকে।

এই বলে আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকালাম। জগলু ভাই বললেন, একটা বাচা ছেলেকে একা রেখে বাবা চিটাগাং চলে গেছে। এটা কেমন কথা?

আমি বললাম, বাবু নামের আরেকটা ছেলেকে ফেলে রেখে বাবা সারা ঢাকা শহর ঘুরছে কিন্তু ছেলেটার সঙ্গে দেখা করছে না; এটাই বাঁ কেমন কথা?

বাবুর অবস্থার সঙ্গে এই ছেলের অবস্থা মেলাবে না। বাবুর সঙ্গে অনেকেই আছে। But this boy is all by himself.

শুভ্ৰ এখন স্বাভাবিক হয়েছে। আমার দিকে তাকিয়েছে। মিটমিট করে হাসছে। আমি বললাম, তোর বাপ তোকে ফেলে চলে গেল কেন? তোকে নিয়ে গেল না কেন?

শুভ্র বলল, বাবা যদি বাসে করে কিংবা ট্রেনে করে যেত তাহলে তো আমাকে নিয়েই যেত। বাবা গেছে বড় স্যারের সঙ্গে বিমানে। সেখানে আমাকে কিভাবে নেবে। বাবা কি বড় স্যারকে বলকে— আমার ছেলেটাকে সঙ্গে নেই?

আমি বললাম, তা ঠিক।

শুভ্র বলল, হিমু চাচু তুমি কি কখনো বিমানে চড়েছ?

আমি বললাম, না। আমি উড়াউড়ির মধ্যে নাই।

শুভ্ৰ জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, চাচু আপনি কখনো বিমানে চড়েছেন?

জগলু ভাই শুভ্রের প্রশ্নে হঠাৎ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলেন। হয়ত তিনি ভাবতেই পারেন নি এত আন্তরিক ভঙ্গিতে অপরিচিত একটা ছেলে তাকে প্রশ্ন করবে। তিনি থতমত খেয়ে বললেন, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছ?

শুভ্র বলল, জ্বি।

জগলু বলল, আমি অনেকবার চড়েছি।

চাচু আপনি ভয় পান নি।

প্রথমবার যখন চড়েছি তখন খুবই ভয় পেয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী রেনু…

জগলু ভাইয়ের কথার মাঝখানে শুভ্র বলল, চাচু আপনি চোখ থেকে সানগ্নাস খুলেন। আমি আপনার চোখ দেখতে পারছি না।

জগলু ভাই সানগ্লাস খুললেন। শুভ্রের পাশে চৌকিতে এসে বসলেন। তাঁর ভাব-ভঙ্গিতেই বুঝছি। তিনি দীর্ঘ গল্প শুরু করবেন। আমি বললাম, জগলু ভাই আমাদের একটা কাজ ছিল না? সুটকেস উদ্ধার করা?

আরেক দিন উদ্ধার হবে।

আপনি কতক্ষণ থাকবেন। এখানে?

থাকব কিছুক্ষণ।

আমার একটা কাজ ছিল যে।

কাজ থাকলে চলে যাও। তোমাকে তো আমি শিকল দিয়ে বেঁধে রাখি নি।

তাহলে একটা সিগারেট দিন। সিগারেট টানতে টানতে চলে যাই।

জগলু ভাই বললেন, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যে সিগারেট টানতে পারবে না। এখানে সিগারেট শেষ করে তারপর যাও।

আমি সিগারেট ধরালাম। জগলু ভাই গল্প শুরু করলেন। শুভ্ৰ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। জগলু ভাই হাত নেড়ে গল্প শুরু করেছেন— জমাটি গল্প— আমি তখন থার্ড ইয়ার অনার্সের ছাত্ৰ–চারমাস পরে ফাইনাল পরীক্ষা। এর মধ্যে বিয়ে করে— বিরাট ঝামেলায় পড়েছি।

শুভ্ৰ বলল, ঝামেলায় পড়েছেন কেন?

মেয়ের বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে। তারা আমার নামে একটা মামলাও করে দিয়েছেন। আমি না-কি জোর-জবরদস্তি করে তাদের মেয়েকে আটকে রেখেছি। পুলিশ আমাকে খুঁজছে। আমি তখন ঠিক

শুভ্ৰ কথার মাঝখানে আবার প্রশ্ন করল, চাচু গল্প শুরু করার আগে বলুন পুলিশ কি শেষ পর্যন্ত আপনাকে ধরতে পেরেছিল।

হুঁ। কক্সবাজারে এক হোটেলে ধরে। আমাকে এবং তোমার চাচীকে।

কী ভয়ংকর!

ভয়ংকর তো বটেই। থানা-পুলিশ-হাজত। আমাকে কোর্টে চালান করে দিল। সেখানে আরেক নাটক। তোমার চাচী বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের চাপে পড়ে বলে বাসল, এই লোককে আমি চিনি না। সে আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। তোমার চাচীর কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে কাঠগড়ায় পড়ে গেলাম।

শুভ্র বলল, চাচা আমি এই গল্পটা আগে শুনব।

জগলু ভাই বললেন, ঠিক আছে— এইটাই আগে। বলেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলে যাও। তোমার সঙ্গে রাতে কথা হবে।

গভীর রাতে জগলু ভাই টেলিফোন করলেন। আমি তখন নিজের বিছানায় শোবার আয়োজন করছি। বৃষ্টি চলছেই। সন্ধ্যার দিকে একটু থেমেছিল— সন্ধ্যার পর থেকে প্রবল বর্ষণ এবং দমকা বাতাস। ঢাকা শহরে ইলেকট্রিসিটিও নেই। মেইন ইলেকট্রিক গ্ৰীড নাকি ফেল করেছে।

গাঢ় অন্ধকারে চাদরের নিচ থেকে টেলিফোনে কথা বলার ভাল মজা আছে। আমি জগলু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে মজা পাচ্ছি।

হ্যালো হিমু!

ইয়েস জগলু ভাই। আপনি কোথায়?

আমি শুভ্রের বাসায়।

বলেন কি? আটকা পরে গেছেন।

আটকা পরার তো কিছু নাই। এমন ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে একটা বাচ্চা ছেলেকে এটা ফেলে রেখে আমি যাই কিভাবে?

সেটাও কথা। রাতে কি এখানেই থাকবেন?

এ ছাড়া আমার কি অন্য কোনো বিকল্প আছে? ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। বাচ্চা একটা ছেলে।

আপনাদের খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে। নিজেরাই রাধলাম। ডিম ছিল, ডাল ছিল। ডিম, ডাল, চাল মিশিয়ে খিচুরি টাইপ একটা বস্তু তৈরী করেছি। খেতে ভাল হয়েছে।

আপনি রাঁধলেন।

হ্যাঁ আমি; শুভ্র ছিল আমার এসিস্টেন্ট।

শুভ্র কি জেগে আছে, না ঘুমুচ্ছে?

ঘুমাচ্ছে। মজার একটা কথা শোন হিমু যেই আমি ছেলেটাকে বললাম, এত রাতে তোমাকে একা ফেলে। আমি যাব না। ওমি সে কি করল যান? ঝাঁপ দিয়ে আমার গায়ে এসে পড়ল। আমি প্রস্তুত ছিলাম না। হুড়মুড়ে করে চৌকি থেকে নিচে পড়ে গেলাম। হা হা হা।

19/08/2022

হুমায়ূন আহমেদ -হিমু সমগ্র
(আঙুল কাটা জগলু part- 03)

আরব্য রজনীর সিন্দাবাদ সাহেব ঘাড়ে ভূত নিয়ে কতদিন হাঁটাহাঁটি করেছেন, তার উল্লেখ মূল বই-এ নেই। তবে আমি গত ছদিন সুটকেসনামক ভূত নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছি। যেখানে যাই হাতে সুটকেস। জগলু ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই। তিনি মোবাইল ধরছেন না। টেলিফোন করলেই প্রাণহীন নারীকণ্ঠ বলছে, এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। একটু পরে আবার চেষ্টা করুন। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

খবরের কাগজ পড়া আমার স্বভাবের মধ্যে নেই, তার পরেও গত ছদিন খবরের কাগজ পড়লাম জগলু ভাইয়ের কোনো খবর পত্রিকায় এসেছে কি না জানার জন্য। তিনি কি র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েছেন, এবং পরবর্তীতে ক্রসফায়ারে নিহত? চিতা নামের আরেক গ্রুপের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদের ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে এরাও র‍্যাবের দূর-সম্পর্কের কাজিন। তাদের হাতে ধরা পড়লেও খবর আছে। এরাও ক্রসফায়ার বিষয়টা জানে।

পত্রিকায় গত সপ্তাহে এ-ধরনের কোনো খবর আসেনি। তা হলে জগলু ভাইয়ের ব্যাপারটা কী? এই টাইপের মানুষ সবসময় রিলে রেইসে থাকে। এদের হাত থেকে যে–কোনো সময় ব্যাটন পড়ে যেতে পারে। জগলু ভাইয়ের হাতের ব্যাটন কি পড়ে গেছে? অন্য একজন সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ছুটিতে শুরু করেছে? রিলে রেইসের দৌড়বিদরা হারিয়ে যান, ব্যাটন হারায় না।

জগলু ভাইয়ের মোবাইলে বাবু নাম এন্ট্রি করা আছে। বাদল বের করে দিয়েছে। আমার ধারণা বাবু জগলু ভাইয়ের ছেলে। সেই নাম্বারে বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। ছেলে কি পারবে বাবার কোনো খবর দিতে?

বুধবার দুপুরে জগলু ভাইয়ের ছেলেকে টেলিফোন করলাম। গভীর এবং ভারী গলায় একটা বাচ্চা ছেলে বলল, তুমি কে?

আমি বললাম, আমি সম্পর্কে তোমার চাচা হই। তুমি জগলু ভাইয়ের ছেলে না?

হুঁ।

তোমার নাম কী?

আমার নাম হিমু।

আমার বাবা কোথায়?

আমি বললাম, জানি না তো কোথায়!

জানো না কেন?

তোমার কি বাবাকে খুব দরকার?

হুঁ।

কীজন্যে দরকার বলো তো?

তোমাকে বলব না।

তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবার সম্ভাবনা আমার আছে। কাজেই আমাকে বলতে পারো। আমি উনাকে বলে দেব।

তুমি আর কাউকে বলবে না তো?

না।

প্রমিজ?

হ্যাঁ, প্রমিজ।

বাবা বলেছিল। আমি জন্মদিনে যা চাই তা-ই আমাকে দেবে। তাকে বলার জন্যে আমি কী চাই!

তুমি কী চাও?

একটা ভূতের বাচ্চা চাই।

ছেলে-বাচ্চা, না মেয়ে-বাচ্চা?

ছেলে-বাচ্চা। আমি মেয়েদের পছন্দ করি না।

ভূতের ছেলে-বাচ্চা যোগাড় করা খুবই কঠিন। একেবারেই যদি যোগাড় করা না যায়, তা হলে কি মেয়ে-বাচ্চায় চলবে?

না চলবে না।

ভালো বিপদ হয়েছে তো!

এইজন্যেই আগে-আগে বললাম। জন্মদিনের তো দেরি আছে।

কত দেরি?

সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ।

ভালো বিপদে পড়া গেল। এত অল্প সময়ে ছেলে-ভূতের বাচ্চা বের করা অতি জটিল ব্যাপার। আমার কলিজা পানি হয়ে যাবে।

তোমাকে কিছু করতে হবে না। বাবা করবে।

তোমার বাবা পারবে না। এইসব জটিল কাজের দায়িত্ব শেষটায় আমার ঘাড়েই এসে পড়বে। এখনো চিন্তা করে বলো মেয়ে-ভূত হলে চলবে কি না।

তোমাকে তো একবার বলেছি চলবে না। আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না। বেশি কথা বলা আমার নিষেধ। ডাক্তার সাহেব নিষেধ করেছেন। আমার অসুখ তো এইজন্যে।

তা হলে বিদায়।

বিদায়।

হ্যালো শোনো ভূতের বাচ্চা দিয়ে কি করবে?

খেলব।

সে ঘুমাবে কোথায়?

আমার সঙ্গে ঘুমাবে।

ভয় পাবে তো।

ভয় পাব না। ভূতের বাচ্চারা ভাল হয়। তারা ভয় দেখায় না। আমি এখন আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না।

বাবুর সঙ্গে কথা বলার পরপরই মিতুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করল। তাকে কিছুক্ষণ বিরক্ত করা। একটু রাগিয়ে দেয়া। এই মেয়েটা এখন আমার টেলিফোন পেলেই রেগে যাচ্ছে। সাধারণ রাগ না, ভয়াবহ টাইপ রাগ। মানুষের স্বভাব হলো, কেউ যখন ভালোবাসে তখন নানান কর্মকাণ্ড করে সেই ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে, আবার কেউ যখন রেগে যায়। তখন তার রাগটাও বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করে।

হ্যালো, মিতু!

আপনি আবার টেলিফোন করেছেন? আবার? আপনাকে আমি কী বলেছি, কখনো টেলিফোন করবেন না। নেভার এভার।

খুব জরুরি কাজে টেলিফোন করেছি। খুব জরুরি বললেও কম বলা হবে। জরুরির ওপর জরুরি। মহা জরুরি.

আমার সঙ্গে আপনার কী জরুরি কাজ?

একটা তথ্য যদি দিতে পার।

কী তথ্য?

ভূতের বাচ্চা কোথায় পাওয়া যায় বলতে পারবে?

কিসের বাচা?

ভূতের ছেলে-বাচ্চা। একান্তই যদি না পাওয়া যায় মেয়ে-বাচ্চা হলেও চলবে। তবে আমার দরকার ছেলে-বাচ্চা।

আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করার জন্যে টেলিফোনটা করলেন?

রসিকতা না। আসলেই আমার একটা ভূতের ছেলে-বাচ্চা দরকার। একজনকে কথা দিয়েছি। সে পালবে।

হিমু সাহেব শুনুন। আপনার হাত থেকে উদ্ধারের জন্য আমি একটা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি আমার টেলিফোন সেট আর ব্যবহার করব না। আপনি চেষ্টা করেও আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তা ছাড়া এই মঙ্গলবারে আমি বাবাকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। এমনিতেও যোগাযোগ হবে না।

স্যার কি ভালো আছেন?

হ্যাঁ, বাবা ভালো আছেন।

তোমরা চলে যাবে, তার আগে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না?

দেখা হবার কোনো প্রয়োজন কি আছে?

না, প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ছাড়াও কিন্তু আমরা অনেক কিছু করি।

কী করি?

এই ধরো আমার টেলিফোন পাওয়ামাত্ৰই তুমি কিন্তু নিজের টেলিফোন অফ করে দিতে পারতে। তা করনি। প্রয়োজন ছাড়াই অনেকক্ষণ কথা বলেছি, এখনো বলছি।

এটা ভদ্রতা।

আমি যে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি এটাও ভদ্রতা। তুমি কি বাসায় আছ?

কেন?

তা হলে এখনই চলে আসি, ভদ্রতার ঝামেলা সেরে ফেলি। মঙ্গলবারের পর তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। শেষ দেখাটা হোক।

ঠিক আছে, আসুন। এক ঘণ্টার মধ্যে আসবেন। আমি এক ঘণ্টা পর বাবাকে নিয়ে বের হব।

আমি একটা ক্যাব নিয়ে চলে আসি?

আপনার ব্যাপার।

আমার একার ব্যাপার না। তোমারও ব্যাপার।

আমার ব্যাপার কীভাবে?

ক্যাবেই আসি বাঁ হেলিকপ্টারেই আসি ভাড়া তো তোমাকেই দিতে হবে। আমার হাত খালি।

আবার রসিকতা! আবার!

আমি টেলিফোন অফ করে উঠে দাঁড়ালাম। আমার হাতে সুটকেস। সুটকেসে পঁচিশ লক্ষ টাকা। কোনো ছিনতাইকারী আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে সুটকেস নিয়ে দৌড় দিচ্ছে না কেন? দেশ থেকে কি ছিনতাই উঠে গেছে?

মেস থেকে বেরুবার সময় মেসের ম্যানেজার বদরুলের সঙ্গে দেখা। বদরুল বলল, হিমু ভাইরে সব সময় দেখি সুটকেস লইয়া ঘুরেন। সুটকেসে আছে কী?

আমি বললাম, টাকা।

কত টাকা?

পঁচিশ লক্ষ টাকা।

বদরুল শব্দ করে হাসা শুরু করল। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে এমন মজার কথা সে আগে কখনো শোনেনি। বদরুল আবার কাকে ডেকে যেন বলছে, হিমু ভাইয়ের সুটকেস–ভরতি টাকা। হা হা হা। পঁচিশ লক্ষ টাকা। হা হা হা।

মিতু সরু চোখে আমার সুটকেসের দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর সাহেবও তাকিয়ে আছেন। পিতা-কন্যা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখিও করলেন। মিতু বলল, সুটকেসটা পরিচিত মনে হচ্ছে।

আমি বললাম, তোমার সুটকেস, পরিচিত মনে হবারই তো কথা।

সুটকেসটা কি ফেরত দিতে এসেছেন?

না। মঙ্গলবার পর্যন্ত তোমার কাছে রেখে যেতে এসেছি। তোমাদের ফ্লাইট কখন?

বিকালে।

আমি সকালে এসে সুটকেস নিয়ে যাব।

মনসুর সাহেব বললেন, ব্যাগে কি টাকা?

জি স্যার। জগলু ভাইকে টাকাটা এখনো দেওয়া হয়নি। আমি সুটকেস নিয়ে নিয়ে ঘুরছি। কয়েকটা দিন ঝাড়া হাত-পা হয়ে ঘুরতে চাই। সুটকেস-হাতে হাঁটা যায় না। রিকশা নিতে হয়। আমার কাছে রিকশা ভাড়া থাকে না।

পিতা-কন্যা দুজনই এখন একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। পিতার দৃষ্টিতে ভয়। কন্যার দৃষ্টিতে বিস্ময়। –

মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বললেন, হিমু। আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।

আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, কোন ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না?

কিছুই বুঝতে পারছি না। বুঝতে চাচ্ছিও না। আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।

মঙ্গলবারের পর অফ হই স্যার? মঙ্গলবার পর্যন্ত সুটকেসটা রাখুন। এই কয়টাদিন আমি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকব। নানান জায়গায় ছোটাছুটি করতে হবে। সুটকেস-হাতে ছোটাছুটি করা যাবে না।

কী নিয়ে ব্যস্ততা?

ভূতের বাচ্চা খুঁজতে হবে। ছেলে-বাচ্চা। একজনের ফরমায়েশ। তাকে একটা ছেলে–ভূতের বাচ্চা দিতে হবে।

পিতা-কন্যা। আবারও মুখ-চাওয়াচাওয়ি করছেন। আমি তাদের সামনে সুটকেস রেখে চলে এলাম। ঘাড় থেকে ভূত নামাবার জন্যে সিন্দাবাদকে নানান কায়দাকানুন করতে হয়েছিল। আমাকে কিছু করতে হয়নি। যাদের ভূত তাদেরকে দিয়ে এসেছি।

আমি লক্ষ করেছি। প্রকৃতি কাকতালীয় বিষয়গুলো পছন্দ করে। মনসুর সাহেব আমাকে বললেন, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও। ঠিক একই বাক্য কিছুক্ষণের মধ্যেই যদি আরো একজন বলে তাকে কি কাকৃতালীয় বলা যাবে না? বাক্যের কোনো শব্দ এদিক-ওদিক নেই।

মনসুর সাহেব আমাকে যা বলেছিলেন খালুসাহেব হুবহু তা-ই বললেন। মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বলেছিলেন। খালুসাহেব বললেন সামান্য অস্থির ভঙ্গিতে। বেশিকম বলতে এইটুকুই।

হিমু, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।

আমি বসে আছি। খালুসাহেবের অফিসে, ঠিক তার সামনে। খালুসাহেব মাসে মাসে আমাকে কিছু হাতখরচ দেন। একটাই শর্ত, আমি বাদলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না। এই মাসে শর্ত পালন করা হয়নি। বাদলের সঙ্গে একই কামরায় একরাত কাটিয়েছি।

আমি কী বলছি শুনতে পেয়েছ?

জি খালুসাহেব।

তুমি আমাদের জীবন থেকে পুরোপুরি অফ হয়ে যাবে।

মাঝেমধ্যে অনা হতে পারব না? ধরুন ঈদের চান্দে অন্য হলাম। বাকি সময়টা অফ।

কখনো না। নেভার।

হাত খরচ নেবার জন্যেও কি আসিব না?

হাতখরচের কথা ভুলে যাও। তুমি যে-অপরাধ করেছ, তারপর হাতখরচ দেয়া দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার চেয়েও খারাপ।

আমি কী করেছি?

তোমার ধারণা তুমি কিছু করনি?

জি না। বরং বাদলের মাথা থেকে গানটা দূর করে দিয়েছি। বাদল আপনাকে বলেনি?

বলেছে।

তা হলে আপনি আমার ওপর রাগ করছেন কেন?

তুমি বাদলের মাথা থেকে গান তুলে এনে আমার মাথায় পুতে দিয়েছ, কাজটা তুমি করেছ ইচ্ছা করে। কারণ, আমি তোমাকে চিনি। আমার চেয়ে ভাল করে তোমাকে কেউ চেনে না।

আপনার মাথায় কোন গান ঢুকিয়েছি? পাগলা হাওয়া?

হাওয়া-ফাওয়া না, হিন্দি গানটা। সঁইয়া দিল মে আনা… আমি এই গান জীবনে কোনোদিন শুনিনি। সেদিন অফিসে আসার সময় ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। এক রেস্টুরেন্টে গানটা বাজছিল। পুরোটা শুনলাম। তার পর থেকে গান মাথায় বাজছে।

বের করার ব্যবস্থা করে দেব?

তোমাকে কিছু করতে হবে না। তুমি সামনে থেকে যাও।

চা-নাশতা খেয়ে যাই। আপনার অফিস থেকে চা-নাশতা না খেয়ে গিয়েছি, এরকম মনে পড়ে না।

এখন থেকে মনে পড়বে। যাও বিদায় হও।

চা-নাশতা নাহয় না-ই খেলাম, এক গ্লাস পানি খেয়ে যাই?

পানিও না। আমার অফিস এখন থেকে তোমার জন্যে কারবালা।

আমি মুখ যথাসম্ভব করুণ করে বললাম, তা হলে কি চলে যাব?

খালুসাহেব বললেন, ভাগো হিঁয়াসে।

হিন্দি গালির পর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তার পরেও দাঁড়িয়ে আছি। খালুসাহেবের রাগের শেষ পর্যায়টা দেখতে ইচ্ছা করছে। শেষ পর্যায়ে এসে কী করবেন? ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন? দারোয়ান ডাকবেন? আরেকটা সম্ভাবনা আছে, ধাপ করে রাগ পড়ে যেতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক তীব্র আবেগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। তীব্র আবেগের উচ্চ–স্তর থেকে মস্তিষ্ককে নামতেই হবে।

মনে হচ্ছে খালুসাহেব সেই তীব্র পর্যায়ে এখনো পৌঁছাননি। এখন তিনি চোখ সরু করে তাকিয়ে আছেন। মুখ সামান্য হাঁ-করা। মুখ থেকে হিসহিস জাতীয় শব্দ হচ্ছে। আমি কি খালুসাহেবকে আবেগের অতি উচ্চস্তরে পৌঁছানোর ব্যাপারে সাহায্য করব? এখন তাকে অতি সহজ ভঙ্গিতে উলটাপালটা দুএকটা কথা বললেই হবে।

কী ব্যাপার, দাঁড়িয়ে আছ যে?

আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, খালুসাহেব, আমি দাঁড়িয়ে আছি না। তো! আমি এখনো বসে আছি। আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি? তা হলে তো আপনার প্ৰেশার হাই হয়েছে। আপনার প্ৰেশারটা মাপানো দরকার।

তুমি বসে আছ?

জি খালুসাহেব। আমি আপনার সামনের চেয়ারটায় বসে আছি। কিছুক্ষণ আগেও পা নাচাচ্ছিলাম, আপনার রাগ দেখে পা নাচানো বন্ধ করেছি।

খালুসাহেব হকচাকিয়ে গেলেন। তিনি চোখে দেখছেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি (তা-ই দেখার কথা, আমি দাঁড়িয়েই আছি), অথচ আমার কথাও ফেলতে পারছেন না।

খালুসাহেব, আমি চলে যাচ্ছি। আপনিও বাসায় চলে যান। রেস্ট নিন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে টানা ঘুম দেন। এখনো কি আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমি দাঁড়িয়ে আছি?

হুঁ।

আমার ধারণা, আপনার মস্তিষ্ক অতিরিক্ত উত্তেজিত। আমার উপস্থিতি সম্ভবত আপনার মস্তিষ্ক নিতে পারছে না। আমি বরং চলে যাই।

না, তুমি বসো।

আমি তো বসেই আছি।

বসে আছ?

জি।

খালুসাহেব বিড়বিড় করে বললেন, ও মাই গড়! বলেই চোখ বন্ধ করলেন। আমি তৎক্ষণাৎ চেয়ারে বসে পড়লাম। খালুসাহেব চোখ মেলে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ভীতগলায় বললেন, তুমি কি এখন বসে। আছ? না-কি দাঁড়িয়ে আছ?

আপনার কাছে কি এখনো মনে হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি?

তিনি জবাব দিলেন না। বড় করে নিশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম, আপনার প্ৰেশারটা তো মনে হয় মাপানো দরকার। আমি কি ফার্মেসি থেকে কোনো–একজনকে প্ৰেশার মাপার জন্যে ধরে নিয়ে আসবে?

খালুসাহেব ক্ষীণগলায় বললেন, আরো কিছু সময় পার হোক। তুমি এখন বসে আছ না। দাঁড়িয়ে আছ?

বসে আছি।

একটু দাঁড়াবে?

অবশ্যই দাঁড়াব।

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, আপনার কাছে কি এখনো মনে হচ্ছে আমি বসে আছি?

না।

তা হলে তো মনে হয় আপনি ঠিক হয়ে গেছেন। খালুসাহেব আমি যাই।

যাই-যাই করছি কেন? বসো।

জি আচ্ছা। চা দিতে বলুন। চা খাই। চায়ের সঙ্গে নাশতা। সকালে কিছু খাইনি।

খালুসাহেব বেল টিপে বেয়ারাকে চা-নাশতার কথা বললেন।

আমি চা খাচ্ছি। খালুসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে এখন তাঁর দৃষ্টি স্বাভাবিক। মস্তিষ্ক মনে হয় অতি উত্তেজিত অবস্থা থেকে নরমাল অবস্থায় দ্রুত ফিরে আসছে।

হিমু!

জি খালুসাহেব?

প্রশ্ন করলে সত্যি জবাব দেবে?

অবশ্যই। আমি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে মিথ্যা বলি না।

খালুসাহেব সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে দেয়াশলাই জ্বালিয়ে ধরালেন। প্রথমবারে পারলেন না। কয়েকটা কাঠি নষ্ট হলো। সিগারেটে লম্বা লম্বা টান দিয়ে নাকে-মুখে ধোঁয়া বের করতে করতে বললেন, তুমি আমার কাছে চা খেতে চেয়েছিলে, আমি না করে দিলাম। অফিস থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলাম। তখন তুমি ঠিক করলে যে-করেই হোক তুমি অফিসে থাকবে। চা-নাশতা খাবে। তারপর মাসের টাকাটা নিয়ে বিদেয় হবে। তোমার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে তুমি একটা কৌশল বের করলে। আমাকে বিভ্রান্ত করলে। আমি কি ঠিক বলছি?

জি খালুসাহেব।

দাঁড়িয়ে থাকা বসে থাকার খেলা খেললে। দাঁড়িয়ে থেকেও বললে বসে আছি। ঠিক বলেছি?

জি খালুসাহেব।

তুমি যে অতি বিপজ্জনক একটি প্রাণী তা কি তুমি জানো?

না খালুসাহেব, এটা জানি না।

তুমি অতি বিপজ্জনক।

খালুসাহেব মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করতে করতে বললেন, তোমার মাসিক অ্যালাউন্স। আমি দিয়ে দিচ্ছি, এখন চলে যাও।

জি আচ্ছা।

প্রতিমাসের দুই তারিখে এসে টাকা নিয়ে যেও, আমি তোমার অ্যালাউন্স বন্ধ করব না।

থ্যাঙ্ক য়্যু।

তবে তুমি আমার কাছে আসবে না। আমার সেক্রেটারির কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবে।

জি আচ্ছা।

খালুসাহেব সিগারেটে শেষ লম্বা টান দিয়ে সিগারেট অ্যাশট্রেতে রাখতে রাখতে বললেন, এখন তোমাকে অতি ভদ্রভাবে বলছি চলে যাও। নো হার্ড ফিলিংস।

আমি খালুসাহেবের অফিস থেকে সরাসরি চলে এলাম রমনা পার্কে।

দুপুরে ঘুমানোর জন্যে রমনা পার্ক অতি উত্তম জায়গা। এই সময় পার্ক থাকে। ফাকা। যে–কোনো একটা খালি বেঞ্চের দখল অতি সহজেই নেওয়া যায়। মাথার ওপর ঘন পাতার গাছ দেখে বেঞ্চ খুঁজে নিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়া। মাথা-মালিশের ছেলে।পুলে দুপুরবেলায় বেশি ঘুরঘুর করে। তাদের কোনো-একজনকে ডেকে নিলে আরামের ষোলোকলা পূর্ণ হবে। এরা ঘণ্টা হিসেবে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাঁচ টাকা করে ঘণ্টা।

এখন আমার মাথার ওপর দুটা বড় সাইজের ছাতিম গাছ। ছাতিম গাছের পাতার ছায়া পড়েছে বেঞ্চে। আমি পা লম্বা করে শুয়ে আছি। আমার মাথায় ঝাঁঝালো সরিষার তেল মালিশ করে দিচ্ছে জিতু মিয়া। তার দায়িত্ত্ব শুধু তেল মালিশ করা না, আমি যেন নির্বিয়ে দুই ঘণ্টা ঘুমুতে পারি সেই ব্যবস্থা করা। জিতু মিয়া বলেছে, ভাইজান লিচ্চিন্ত থাহেন।

আমি লিচিন্ত আছি।

জিতু মিয়া মাথা-মালিশের ব্যাপারে এক্সপার্ট বলেই মনে হচ্ছে। নানানভাবে দলাইমলাই করছে। আমার চোখ ভারী হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পড়লে মাথা-মালিশের আরাম থেকে বঞ্চিত হব বলে প্ৰাণপণে জেগে থাকার চেষ্টা করছি। জিতুর সঙ্গে টুকটাক কথাও বলছি।

দুপুরে খাওয়াদাওয়া হয়েছে?

নাহ্‌।

কিছু রোজগার হয় নাই?

নাহ্‌।

আমি প্রথম কাস্টমার?

সকালে একজন পাইছিলাম। হে খারাপ কাজ করতে চায়।

তোর কি চুরির অভ্যাস আছে?

অল্পবিস্তর আছে।

চুরিটা করিস কখন? কাস্টমার ঘুমিয়ে পড়লে?

জিতু মিয়া ফিক করে হেসে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমার পকেটে মোবাইল টেলিফোন আছে। টাকা আছে। চুরি যদি করিস মোবাইলটা নিস না। অন্যের জিনিস।

আপনি লিচ্চিন্তে ঘুমান। আপনের জিনিস নিমুনা।

নিবি না কেন?

আফনেরে চিনি। আফনে হইলদা সাধু।

আমার নাম জানিস?

আপনে হিমু ভাইজান। আপনে কতবার পার্কে আইসা ঘুম গেছেন। একবার আপনের পকেট থাইক্যা সাতশ টাকা চুরি গেছিল।

তুই নিয়েছিলি?

আমার ভাই নিছিল।

সে কই?

তার খুঁজ নাই।

তোরা কি দুই ভাই।

একটা ভইনও আছে।

নাম কি বোনের?

কালিমা।

কালিমা কীরকম নাম?

গায়ের রং কলো? কালো না, ময়লা।

বোন থাকে কই?

তারও খুঁজ নাই।

এখানে দুপুরে খাওয়াদাওয়া কী পাওয়া যায়?

সবই পাওয়া যায়। ভাত-মাছের হোটেল আছে, কাচিচ্চ বিরিয়ানি, মোরগপোলাও আছে।

তোর কোনটা পছন্দ? ভাত-মাছ, না মোরগপোলাও, কাচিচ্চ বিরিয়ানি?

মোরগপোলাও।

আমি ঘুমিয়ে পড়লে পকেট থেকে টাকা নিয়ে মোরগপোলাও খেয়ে আসবি।

আফনে ঘুম থাইক্যা উঠেন, তার পরে খামুনে।

সেটাও খারাপ হয় না। আমিও দুপুরে কিছু খাইনি, একসঙ্গে খাব। এরা মোরগপোলাও রাধে কেমন?

জব্বর রান্ধে। এক মাইল দূর থাইক্যা বাস আসে।

এই জিনিস খেয়ে দেখা দরকার। ঘুম থেকে উঠে নেই, ডাবল মোরগপোলাও খাব।

কতক্ষণ। ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল মোবাইলের শব্দে। গানের মতো সুরে পকেটে মোবাইল বাজছে। কানে ধরতেই জগলু ভাইয়ের কঠিন গলা শোনা গেল, মোবাইল ধরো না কেন? রিংয়ের পর রিং হচ্ছে, ধরছ না।

আমি মধুর গলায় বললাম, কেমন আছেন জগলু ভাই?

মোবাইল ধরতে এতক্ষণ লাগল কেন?

ঘুমাচ্ছিলাম জগলু ভাই।

আমার জিনিস কোথায়?

সেইফ জায়গায় আছে।

তুমি কোথায়?

পার্কে।

কোথায়?

পার্কে। রমনা পার্কে।

পার্কে কি কর।

ঘুমাচ্ছি।

পার্কে ঘুমাচ্ছ? ঘুমাবার জন্য অতি উত্তম জায়গা জগলু ভাই। সব ধরনের মানুষের ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে।

ঠিক কোন জায়গায় আছ বলো, আমি দশ মিনিটের মধ্যে উপস্থিত হব। জিনিস নিয়ে যাব।

আপনি এতদিন ছিলেন কোথায়?

আমি এতদিন কোথায় ছিলাম সেটা দিয়ে তোমার দরকার নেই।

দুপুরে কি খাওয়াদাওয়া করেছেন? খাওয়াদাওয়া না করলে আমার সঙ্গে খেতে পারেন। এখানে অসাধারণ মোরগপোলাও পাওয়া যায়, যার সুঘ্ৰাণ এক মাইল দূর থেকে পাওয়া যায়।

তুমি কোথায় আছ, আমি কোন গেট দিয়ে ঢুকব সেটা বলো।

আপনি একা আসবেন? না সঙ্গে লোকজন থাকবে?

কোনো বাড়তি কথা না। যেটা জানতে চাচ্ছি সেটা বলো।

আঙুল-কাটা জগলু ভাই আমার পাশে বেঞ্চিতে বসে আছেন। তার চুলী সুন্দর করে আঁচড়ানো। চোখে সানগ্লাস। ইন্ত্রি-করা হালকা সবুজ রঙের শার্ট ইন করে পরেছেন। প্যান্টের রং ধবধবে সাদা। পায়ের কালো জুতা চকচক করছে। মনে হচ্ছে এখানে আসার আগে বুট-পালিশওয়ালাকে দিয়ে জুতা পালিশ করিয়েছেন। গায়ে সেন্ট মেখেছেন। তবে সেন্টের গন্ধ ভালো না। নাকে লাগে।

জগলু ভাইয়ের বসে থাকার মধ্যে হতভম্ব ভাব আছে। মনে হচ্ছে তিনি জমে পাথর হয়ে গেছেন। সুটকেস মনসুর সাহেবের বাসায় রেখে এসেছি শোনার পর থেকে তার এই অবস্থা।

জিতু মিয়াকে তিন ডাবল মোরগপোলাও আনতে পাঠিয়েছি। সে বলেছে আনতে দেরি হবে। ফ্রেশ রান্না করিয়ে আনবে। আমি এবং জগলু ভাইয়ের আশপাশে কেউ নেই। তার পরেও জাগলু ভাই যে চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন তা বোঝা যাচ্ছে। তিনি একা আসেননি। তার সঙ্গে আরো দুজন আছে। এই দুজনের কাউকেই আগে দেখিনি। এরা দূর থেকে জগলু ভাইয়ের দিকে লক্ষ রাখছে।

তুমি সুটকেস মনসুর সাহেবের বাসায় রেখে এসেছ?

জি। আপনার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না, এই জিনিস নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরব?

তুমি এক্ষুনি এই মুহুর্তে আমার জিনিস। এনে দেবে। যদি না পার তোমার কিন্তু সময় শেষ।

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এনে দেব। কোনো অসুবিধা নেই। বসে আছ কেন? উঠে দাড়াও। জিনিস নিয়ে কি আমি পার্কে আসব? আপনারা এইখানে অপেক্ষা করবেন?

জগলু ভাই জবাব দিলেন না। সিগারেট ধরালেন। আমি বললাম, ভালোমতো চিন্তাভাবনা করে বলুন।

তুমি এইখানেই নিয়ে আসবে।

ঠিক আছে। খাওয়াদাওয়া করে তারপরে যাই। আপনার জন্যেও মোরগপোলাও আনতে পাঠিয়েছি।

তুমি এক্ষুনি যাবে। এই মুহূর্তে।

আমি উদাস গলায় বললাম, জগলু ভাই, আমি না খেয়ে যাব না।

তোর বাপ যাবে।

আমি সহজ গলায় বললাম, আমার বাপও যাবে না। তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। আর আমি নিজেও যাব না। আসুন খাওয়াদাওয়া করি, তারপর ব্যবস্থা করছি। খাওয়াদাওয়া করলে আপনার নিজের মেজাজও ঠাণ্ডী হবে। ঠাণ্ডা মাথায় আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

তোকে এখনই গুলি করে মেরে ফেলব, হারামজাদা।

এখন মেরে ফেললে সুটকেস কে এনে দেবে?

শুয়োরের বাচ্চা, চুপ।

আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুই চুপ।

জগলু ভাই হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকালেন। তিনি মনে হয় তার সমস্ত জীবনে এত বিস্মিত হননি। আমি ঠিক আগের মতো ভঙ্গিতে বললাম, মোরগপোলাও আসছে, সোনামুখ করে মোরগপোলাও খাবি। বুঝেছিস? তেড়িবেড়ি করলে থাপ্পড় খাবি।

জিতু মিয়া খাবার নিয়ে আসছে। তার মুখ হাসিহাসি। আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাওয়ার পর পান খাওয়ার অভ্যাস আছে?

তোর জন্যে পান আনিয়ে রাখব? এরকম করে তাকাচিচ্ছস কেন? তোকে এর আগে কেউ তুই করে বলে নাই?

জগলু ভাই মোরগপোলাও খাচ্ছেন। আগ্রহ করেই খাচ্ছেন। তাঁর চেহারা থেকে হতভম্ব ভাবটা অনেকখানি কেটেছে। আমি বললাম, মোরগপোলাওটা ভালো না জগলু ভাই?

তিনি বললেন, হুঁ।

আমি বললাম, আপনার ছেলেরও তো মোরগপোলাও পছন্দ।

জগলু ভাই বলল, তুমি জানলে কীভাবে?

আমার সঙ্গে কথা হয়। সে জন্মদিনে মোরগপোলাও খাবে বলে বলেছে। আমরা এই বাবুর্চিকেই অর্ডার দিয়ে রাখি?

জগলু ভাই বললেন, ওর সঙ্গে তোমার আর কী কথা হয়েছে?

জন্মদিনে সে কী উপহার চায় সেটা আপনাকে বলতে বলেছে।

কী উপহার চায়?

একটা ছেলে-ভূতের বাচ্চা চায়। খেলনা না। আসল জিনিস।

ছেলে-ভূতের বাচ্চা আমি পাব কোথায়? এটা তার মাথায় আসলো কেন? তোমার সঙ্গে কি তার প্রায়ই কথা হয়।

মাঝে মাঝে হয়। আপনার সঙ্গে কথা হয় না?

না।

টেলিফোন করেন না কেন? টেলিফোন করলেই তাকে দেখতে যেতে বলবে। সেটা কখনো পারব না।

পারবেন না কেন?

পুলিশের ইনফরমার সবসময় নজর রাখছে। ফোন করলেই ধরা পড়ব। মতিকে পাঠিয়েছিলাম। পুলিশ তাকেও ধরে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে গেছে। জানি না। মনে হয় মেরেই ফেলেছে।

খাওয়া শেষ করে জগলু ভাই পান খেলেন। সিগারেট ধরালেন, তার চেহারায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটা সুখী-সুখী ভাব চলে এল। আমি বললাম, জগলু ভাই একটা কাজ করুন লম্বা হয়ে বেঞ্চীতে শুয়ে পড়ুন।

কেন?

জিতু মিয়া আপনার মাথা মালিশ করে দেবে। মাথা মালিশে ডিগ্ৰী দেবার ব্যবস্থা থাকলে এই বিষয়ে সে Ph.D. পেয়ে যেত। জিতু আপনার মাথা মালিশ করবে। আপনি পাঁচ-দশ মিনিটের তোফা ঘুম দেবেন। দুপুরের ঘুমটাকে কি বলে জগলু ভাই?

সিয়াস্তা!

আপনি সিয়াস্তায় চলে যাবেন। আমি আপনার কানের কাছে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আবৃত্তি করব।

তুমি রবার্ট ফ্রস্ট জান?

কয়েকটা জানি। আপনি শুনলে অবাক হবেন আমার বাবা আপনার মতই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। আপনাকে কি দুই-এক লাইন রবার্ট ফ্রস্ট শুনাব?

না। তুমি জিতু মিয়াকে সামনে থেকে যেতে বল।

সে তো আপনার সামনেই বসে আছে।

জগলু ভাই জিতু মিয়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন ধমক দিলেন— যা ভাগ লাথি দিয়ে কোমড় ভেঙ্গে ফেলব।

জিতু মিয়া মুখ শুকনা করে উঠে চলে গেল। আমি বললাম, জগলু ভাই জনগণের সঙ্গে আপনার ব্যবহার তো খুবই ভাল।

তিনি আড়াচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। আমি বললাম, জগলু ভাই টপ টেরার হতে হলে কি কি গুণাবলী লাগে একটু বলবেন?

কেন?

কৌতূহল। এর বেশি কিছু না। আমি নিজে চিন্তা করে কয়েকটা পয়েন্ট বের করেছি। আপনার সঙ্গে মিলে কি-না বুঝতে পারছি না। বলব?

বল শুনি।

প্রথমেই লাগে খারাপ বাবা-মা। একটা ভাল বাবা এবং একটা খারাপ মা কখনো-সন্ত্রাসী ছেলের জন্ম দিতে পারেন না।

জগলু ভাই হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, তুমি তোমার স্বভাব মত আমার সঙ্গে ফাইজলামী করছ। এটা আর করবে না।

জ্বি আচ্ছা করব না।

আমার বাবা-মা আদর্শ মানুষ ছিলেন। বাবা ছিলেন নান্দিনা হাই স্কুলের অংকের শিক্ষক। বাবার যে কোন একজন ছাত্রকে ডেকে তুমি যদি বল— অংক বদরুলকে চোন? সেই ছাত্র চোখের পানি ফেলে দেবে।

উনার নাম অংক বদরুল?

হুঁ। বাবা কি রকম মানুষ ছিল শুনতে চাও?

চাই।

বাবাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত। আপনার ছেলে-মেয়ে কি? বাবা বলত আমার দুই মেয়ে, পুত্র সংখ্যা কয়েক হাজার। বাবা তার সব ছাত্রকে পুত্ৰ মনে করত। পনেরো-বিশ বছরের পুরাতন ছাত্রদের নামও বাবার মনে থাকত। একটা ঘটনা বলি শোন— বাবার সঙ্গে নিউমার্কেট কাচা বাজারে গিয়েছি। এক লোক বিশাল সাইজের একটা কাতল মাছ কিনছে। সম্ভবত বাজারের সবচে বড় কাতল। তার চারদিকে ভিড় জমে গেছে। বাবা ভিড় ঠেলে লোকটার কাছে গিয়ে বললেন, তুই মাসুদ না? তোকে একবার চড়মেরেছিলাম মনে আছে? এক থাপ্পর খেয়ে তোর জ্বর এসে গেল। ঐ লোক সঙ্গে সঙ্গে বাবার পায়ে পড়ে গেল। তাকে টেনে তোলা যায় না। এমন অবস্থা।

আমি বললাম, তারপর ঐ লোক কি করল? কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে দিয়ে গেল?

তুমি জান কিভাবে?

অনুমান করছি।

এখানে অনুমানের কোনো ব্যাপারই নাই। অবশ্যই এই ঘটনা তুমি জান। কিভাবে জান বল। এই মুহূর্তে বল।

ড্রাঙ্গালু ভাই আপনি খামাখা উত্তেজিত হচ্ছেন। আমি অনুমানে বলছি।

অনুমানটা করলে কিভাবে?

আপনার বাবার একজন ছাত্র আপনার বাবাকে দেখে তার পা ছয়ে সালাম করেছে এটা তো কোনো বড় ঘটনা না। একজন প্রিয় শিক্ষকের দেখা পেলে সব ছাত্ররাই এ রকম করবে। ঐ ছাত্র বিশাল কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে এটাই ঘটনা। এই কারণেই আপনি ঘটনাটা মনে রেখেছেন।

তোমার যুক্তি ঠিক আছে।

আমি বললাম, আপনার বাবা কি আপনার উত্থান দেখে যেতে পেরেছেন?

জগলু ভাই জবাব দিলেন না। আমি বললাম, জগলু ভাই আপনি আপনার বাবার গল্প খুব আনন্দ নিয়ে করেছেন। গল্পের একটা পর্যায়ে দেখলাম। আপনার চোখ চিকচিক করছে। বাবার গল্প করে যে আনন্দ আপনি পেয়েছেন সেই আনন্দ কিন্তু আপনার ছেলে বাবু পাবে না। আপনাকে নিয়ে কোনো গল্প করতে গিয়ে তার চোখ চক চক করবে না।

উপদেশ দিচ্ছ?

জ্বি না।

থাপ্পর দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব হারামজাদা।

দাঁত ফেলে দেবেন?

অবশ্যই দাঁত ফেলে দেব। তুই লেকচার কপচাচ্ছিস। তুই আমাকে মরালিটি শিখাস? একটা সোসাইটিতে সব ধরনের মানুষ থাকবে। সাধুসন্ত্রাসী যেমন থাকবে, চোর-ডাকাতও থাকবে। সন্ত্রাসী থাকবে, চাঁদাবাজ থাকবে। তুই জঙ্গলে কখনও ঢুকেছিস। জঙ্গলে ফলের গাছ যেমন আছে— কাঁটা গাছও আছে।

ফুলের বাগানে কিন্তু শুধু ফুল গাছেই আছে।

ঐ ফুলের বাগান মানুষের তৈরি প্রকৃতির তৈরি না।

প্রকৃতি সব দিয়েছে যাতে আমরা মানুষরা বিচার-বিবেচনা করে ভালমন্দ আলাদা করতে পারি।

চুপ।

জগলু ভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। জগলু ভাই থমথমে গলায় বললেন, তুই যাচ্ছিস কোথায়?

আপনাকে সুটকেসটা দিতে হবে না? চলুন আমার সঙ্গে সুটকেস রিলিজ করে আপনার হাতে হাতে দিয়ে দেই।

চল।

মাঝখানে শুধু দুই মিনিট সময় নেব। একটা রাস্তায় দুই মিনিটের জন্যে যাব। আপনার কি অসুবিধা আছে জগলু ভাই?

জগলু ভাই জবাব দিলেন না। আরেকটা সিগারেট ধরালেন।

18/08/2022

হুমায়ূন আহমেদ -হিমু সমগ্র
(আঙুল কাটা জগলু part- 02)

স্লিপিং গাউন এবং পাইপ এই দুটি বস্তু বাংলাদেশ থেকে উঠে গেছে বলে আমার ধারণা। এই দুই বস্তু এখন শুধু সিনেমায় দেখা যায়।

নায়িকার বড়লোক বাবারা ক্লিপিং গাউন পরে ঠোঁটে পাইপ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে ড্রাইভার জাতীয় কারো সঙ্গে কথা বলেন (যে তার মেয়ের প্রেমে পড়েছে)– তুমি কি জানো আমার বংশৰ্গৌরব? তুমি বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চাও, এত তোমার স্পর্ধা? তুমি আমার খানদান ধুলায় লুটিয়ে দিতে চাও…ইত্যাদি ইত্যাদি।

খালুসাহেব খানদানি বংশের একজনের মতোই আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন, কী চাও?

আমি বিনীতভাবে বললাম, কিছু চাই না খালুসাহেব।

কিছু চাও না, এদিকে বিছানা-বালিশ নিয়ে উপস্থিত হয়েছ?

বিছানা-বালিশ না খালুসাহেব। শুধু একটা সুটকেস।

সুটকেসটা নিয়েই-বা এসেছি কেন? আমি তো তোমাকে বলেছি, এবাড়ি তোমার জন্যে আউট অব বাউন্ড এরিয়া। বলেছি না?

জি, বলেছেন।

তুমি আমার ছেলের মাথা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছ, এটা জানো?

আমি জবাব দিলাম না। খালুসাহেবের রাগ বাড়ছে। কারোর রাগ যখন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে, তখন চুপ করে থাকলে চক্রবৃদ্ধিটা কেটে যায়।

তুমি যেভাবে সুটকেস বগলে নিয়ে ঢুকেছ ঠিক সেইভাবে সুটকেস বগালে নিয়ে চলে যাবে। ডাইনে-বামে তাকাবে না।

রিকশা ছেড়ে দিয়েছি যে খালুসাহেব। বাইরে বৃষ্টি, এখন যাই কীভাবে!

রোদ-বৃষ্টি তোমার জন্যে কোনো ব্যাপার না। তুমি ভিজতে ভিজতে চলে যাবে, এবং এখনই তা করবে। দিস ইজ অ্যান অর্ডার।

বাদলের কাছে সুটকেসটা রেখে চলে যাই। সুটকেসে দামি কিছু জিনিস আছে।

তোমার সুটকেসে যদি কোহিনুর হীরাও থাকে আই ডোন্ট কেয়ার, গো গো।

আমি খালুসাহেবের দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে বললাম ঠিক আছে খালুসাহেব, আমি চলে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সম্পর্কে একটা প্ৰশংসাসূচক কথা বলে যেতে চাই যদি অনুমতি দেন।

খালুসাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, প্রশংসাসূচক কী কথা?

আপনি আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন, রাগােরাগিও করলেন। কিন্তু সবই করলেন পাইপ মুখে রেখে। একবারও ঠোঁট থেকে পাইপ পড়ে গেল না। এটা কীভাবে করলেন? ভালো প্র্যাকটিস ছাড়া এটা সম্ভব না।

খালুসাহেব মুখ থেকে পাইপ হাতে নিলেন। গলার স্বর এক ধাপ নামালেন। সেইসঙ্গে চোখের দৃষ্টি কিছুটা শাণিয়ে নিয়ে বললেন, হিমু, তোমার স্বভাব আমি জানি। তুমি জটিল কথাবার্তার সময় উদ্ভট কিছু কথা বলে বক্তার কনসেন্ট্রেশন নষ্ট করে দাও। তাকে কনফিউজ করো। আমাকে নিয়ে এই খেলাটা খেলবে না।

জি আচ্ছা।

একজন বাবা যখন দেখে তার অতি বুদ্ধিমান একটি ছেলে কারো পাল্লায় পড়ে ভেজিটেবল হয়ে গেছে তখন সেই বাবার কেমন লাগে তুমি বুঝবে না। তুমি কি জানো এখন বাদলকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখছে?

জানি না তো!

ড. প্রফেসর সামসুল আলম, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাইকিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান, বাদলকে এখন দেখছেন। বাদলের কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। এই অবস্থায় আমি চাই না বাদল আবার তোমার পাল্লায় পড়ুক।

বাদলের কিছু উন্নতি হয়েছে?

অবশ্যই হয়েছে।

উনি কি বাদলের মাথা থেকে গানটা বের করতে পেরেছেন?

খালু সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, বাদলের মাথা থেকে গান বের করা মানে কী? তার মাথায় কী গান?

জটিল একটা গান তার মাথায় অনেক দিন থেকে ঘুরপাক খাচ্ছে। ক্রমাগত বেজেই যাচ্ছে। আমার ধারণা, মূল কালপ্রিট ওই গান। প্রফেসর সাহেব যদি কোনোমতে বড়শি দিয়ে ওই গান বের করে নিয়ে আসতে পারেন। তা হলেই কেল্লা ফতে। বাদল ভেজিটেবল অবস্থা থেকে বের হয়ে যেত।

খালুসাহেব হতভম্ব গলায় বললেন, গানের কথা তো কিছুই জানি না। আমি বললাম, বৃষ্টিটা এখন মনে হয় একটু কম। খালুসাহেব, আমি তা হলে যাই। রাস্তার মোড় থেকে একটা রিকশা নিয়ে নেব।

দাড়াও দাড়াও, গানের ব্যাপারটা আগে ফয়সালা করি, তারপর যাবে।

গানের ব্যাপারটা তো খালুসাহেব চট করে ফয়সালা করা যাবে না।

দেরি হবে। তখন রিকশা পাওয়া যাবে না। ঝড়বৃষ্টির রাতে এমনিতেই রিকশা থাকে না।

দেরি হলে থেকে যাবে। এসো আমার ঘরে।

আমি একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস লক্ষ করলাম, খালুসাহেব পাইপ মুখ থেকে খুলে হাতে নেওয়ার পর থেকে মোটামুটি স্বাভাবিক গলায় কথা বলছেন। কথা বলার ভঙ্গির সঙ্গে পোশাকের সম্পর্ক নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে কি না কে জানে। ছোটখাটো একটা গবেষণা হতে পারে। যে চশমা পরে সে চোখে চশমা থাকা অবস্থায় কীভাবে কথা বলে এবং নাথাকা অবস্থায় কীভাবে কথা বলে টাইপ গবেষণা।

খালুসাহেব।

বলো।

আমি চট করে সুটকেসটা বাদলের ঘরে রেখে আসি। এক মিনিট লাগবে।

যাও, রেখে আসো। ওর সঙ্গে কথা বলবে না।

অবশ্যই কথা বলব না।

বাদল পদ্মাসনের ভঙ্গিতে খাটে বসে আছে। বিশেষ কোনো যোগাসন নিশ্চয়ই। হোম শব্দ করে নিশ্বাস নিচ্ছে এবং সুন শব্দ করে ফেলছে। যোগাসনের ব্যাপারগুলো নিঃশব্দে হয় বলে জানতাম। এই প্রথম হুম-সুন সিস্টেম দেখলাম। বাদল চোখ মেলে আমাকে দেখেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মুখভরতি হাসি। যে যোগসাধনা করছে, তাকে বিরক্ত করা ঠিক না। এবং এমন কিছু করাও ঠিক না যাতে যোগীর সাধনায় বিঘ্ন হয়। তার পরেও আমি বললাম, তোর খাটের নিচে একটা সুটকেস রাখলাম।

বাদল বলল, রাখো। তুমি যে আসবে এটা আমি জানতাম।

কীভাবে?

তুমি নিজের ইচ্ছায় আসনি। আমি তোমাকে টেলিপ্যাথিক মেসেজ পাঠিয়েছি। তুমি সেই মেসেজ পেয়েই চলে এসেছি। আমার কথা কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে?

অবশ্যই হচ্ছে। তুই খামাখা আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবি কেন?

আমার ধারণা, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি আমার টেবিলের কাছে যাও, দ্যাখো টেবিলে একটা লেখা আছে। কী লেখা সেটা পড়ো। লেখাটা টেবিলঘড়ি দিয়ে চাপা দেয়া।

তুই ধ্যানের মধ্যে ভ্যাড়াভ্যাড় করে কথা বলেই যাচ্ছিস। এতে ধ্যান হবে?

তোমাকে দেখলে আমার মাথার ঠিক থাকে না। হিমু ভাইজান, রাতে থাকবে তো?

হুঁ।

বিছানার কোন পাশে শোবে? ডান পাশে না বাঁ পাশে? নাকি একা ঘুমাতে চাও? তুমি যদি একা ঘুমাতে চাও তা হলে আমি সোফায় শুয়ে থাকব।

এত কথা বলিস না তো, হুম-সুন করতে থাক। আমি খালুজানের সঙ্গে দেখা করে আসি।

টেবিলের ওপর আমার লেখাটা পড়ে তারপর যাও।

বাদল পেনসিল দিয়ে লিখেছে, সন্ধ্যা ছটা একুশ মিনিট। আমি পদ্মাসনে বসে হিমু ভাইজানকে টেলিপ্যাথিক মেসেজ পাঠিয়ে বলেছি। তিনি যেন চলে আসেন। মেসেজ তার কাছে পৌঁছেছে কি না বুঝতে পারছি না।

রাত আটটা দশ। আমি আবারও মেসেজ পাঠিয়েছি। এই মেসেজ ডেলিভারি হয়েছে।

আমি কাগজটা আগের জায়গায় রাখতে রাখতে বললাম, মেসেজ যে ডেলিভারি হয়েছে এটা বুঝলি কীভাবে?

সিগন্যাল পেয়েছি।

কীরকম সিগন্যাল?

মাথার ভেতর পি করে শব্দ হলো।

মোবাইল টেলিফোনে মেসেজ পাঠালে যেরকম শব্দ হয় সেরকম?

হুঁ।

ভালো কথা, গানটার অবস্থা কী?

কোন গানটা?

তোর মাথায় যেটা বাজে, নে দি লিদ না। কী যেন?

ও আচ্ছা, ওই গান? সেটা তো আছেই। শুধু যখন ধ্যানে বসি তখন থাকে না।

এখন নেই?

না।

ধ্যান করতে থাক আমি আসছি।

খালুসাহেব খাটের পাশে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। এখন তার ঠোটে পাইপ। হাতে গ্লাস। গ্লাসে যে-পদার্থ তা দেখতে পানির মতো হলেও পানি যে না তা বোঝা যাচ্ছে। খালুসাহেব অতি সাবধানে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিন। প্রতিবার চুমুক দেবার সময় তাঁর চেহারায় খানিকটা চোর ভাব চলে আসছে। মেজো খালা বাড়িতে নেই মনে হচ্ছে, এই সুবৰ্ণ সুযোগ গ্রহণ করে খালুসাহেব বোতল নামিয়ে ফেলেছেন। গ্লাসের বস্তু যত কমতে থাকবে খালুসাহেবের মেজাজের ততই পরিবর্তন হবে। কোনদিকে হবে সেটা বলা যাচ্ছে না। পরিবর্তন শুভ দিকেও হতে পারে, আবার অশুভ দিকেও হতে পারে।

হিমু!

জি খালুসাহেব?

খাটের ওপর আরাম করে বসে বাদলের গানের ব্যাপারটা বলো। পা তুলে আরাম করে বসে।

আমি খাটে পা তুলে বসলাম। মনে হচ্ছে খালুসাহেবের আজকের পরিবর্তনটা শুভর দিকে যাবে। গলার স্বর এখনই কেমন যেন মিহি। সময়ের সঙ্গে আরো মিহি হবে। আবেগে চোখে পানিও এসে যেতে পারে। তরল বস্তুর অনেক ক্ষমতা।

আমি বললাম, খালুসাহেব, গ্লাসে করে কী খাচ্ছেন?

গ্র্যাসে কী খাচ্ছি সেটা তোমার বিবেচ্য না। বাদলের প্রসঙ্গে বলে। ওর মাথায় কী গান?

বিশেষ একটা গান ক্রমাগত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

ঘুরপাক খাচ্ছে মানে কী?

মানে হচ্ছে গানটা তার মাথায় বাজছে।

মাথায় গান বাজবে কীভাবে? মাথা কি গ্রামোফোন নাকি?

ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম।

বুঝিয়ে বলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

মনে করুন। আপনি কোথাও যাচ্ছেন। হঠাৎ কোনো-একটা নাপিতের দোকান থেকে হিন্দি গান ভেসে এল, সঁইয়া দিল মে আনা রে… গানটা মাথায় খুট করে ঢুকে গেল। আপনি অফিসে চলে গেলেন— গান। কিন্তু বন্দ হলো না, বাজতেই থাকল। অফিস থেকে বিকেলে বাসায় ফিরেছেন। রাতে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমুতে গেছেন, তখনো মাথায় গান বাজছে— সঁইয়া দিল মে আনা রে, আকে ফির না যান রে…। বাদলের এই ব্যাপারটাই ঘটেছে।

সাঁইয়া দিল মে আনা রে মানে কী?

মানে হচ্ছে, বন্ধু আমার হৃদয়ে এসো।

বাদলের মাথায় এই গান ঘুরছে?

এই গান না, তার মাথায় অন্য গান।

কী গান?

নে দি লদ বা রওয়াহালা গপা।

এটা কী ভাষা?

জানি না খালুসাহেব।

অর্থ কী?

অর্থও জানি না। অন্য কোনো গ্রহের ভাষা হতে পারে-এলিয়েনদের ভাষা।

বাদলের মাথায় এলিয়েনদের সঙ্গীত বাজছে?

সম্ভাবনা আছে। ভিন্ন গ্রহের অতি উন্নত প্ৰাণীদের মহান সংগীত হতে পারে।

হিমু, তোমার কি মনে হয় না বাদলের মাথাটা পুরোপুরি গেছে? সে এখন বদ্ধউন্মাদ?

খালুসাহেব! আপনি-আমি মনে করলে, তো হবে না। সামসুল আলম সাহেব যদি মনে করেন তা হলেই শুধু তাকে বদ্ধউন্মাদ বলা যাবে। বদ্ধউন্মাদের সার্টিফিকেট উনি দেবেন। আমরা দেব না।

সামসুল আলমটা কে?

যিনি বাদলের চিকিৎসা করছেন।

তার নাম তুমি জানো কীভাবে?

আপনিই তো বলেছেন।

ও আচ্ছা, আমি বলেছি? নিজেই ভুলে গেছি।

খালুসাহেব ইজিচেয়ার থেকে উঠলেন। বইয়ের র্যাকের কাছে গেলেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সেটের পেছন থেকে চ্যাপটা টাইপ একটা বোতল বের করে নিয়ে এলেন।

হিমু!

জি খালুসাহেব?

গানটা বাদলের মাথা থেকে দূর করার উপায় কী?

উপায় নিয়ে সামসুল আলম সাহেবকে ভাবতে হবে। তারা এই লাইনের বিশেষজ্ঞ।

তুমি তাঁর সঙ্গে কথা বলবে? উনাকে এলিয়েনদের গানের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে?

আপনি চাইলে বলতে পারি।

থাক, দরকার নেই। আমিই বলব। গানটা কী যেন, সাইয়া দিল মে অনানা রে…

না, এই গান না, অন্য গান। দুর্বোধ্য গান–লে দি লদ…

এলিয়েন সঙ্গীত, তা-ই না?

পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছি না। তবে হতে পারে।

খালুসাহেব চ্যাপটা বোতলের জিনিস গ্লাসভরতি করে নিলেন।

তাকে খুবই চিন্তিত লাগছে। মাতালরা চিন্তা করতে ভালোবাসে।

খালুসাহেব এখন তার ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করে আরাম পাচ্ছেন।

হিমু!

জি খালুসাহেব?

রাত কত হয়েছে দ্যাখে তো!

প্রায় বারোটা।

তোমার কি ধারণা রাত বেশি?

সাধারণ মানুষের জন্যে অনেক রাত। তবে সাধু-সন্ন্যাসী কিংবা জগলু ভাইয়ের জন্যে রাতের মাত্র শুরু।

জগলু ভাইটা কে?

আমার পরিচিত একজন। নিশি মানব।

নিশি-মানব মানে?

যারা নিশিতে ঘুরে বেড়ান।

হঠাৎ করে নিশি মানবের কথা এল কিভাবে?

আলোচনাটা আপনার কথার সূত্র ধরেই এসেছে। শুরুটা হয় আপনি যখন জানতে চান রাত বেশি কি-না।

ও আচ্ছা, তোমার কাছে জানতে চাচ্ছিলাম যে এত রাতে সামসুল আলম সাহেবকে টেলিফোন করা ঠিক হবে কি না।

পাগলের ডাক্তারদের মধ্যরাতে টেলিফোন করাই ভালো।

তার নাম্বারটা বলো।

নাম্বার তো খালুসাহেব আমি জানি না।

ভালো সমস্যা হলো তো! এখন কী করা যায়? আমি তো তার নাম্বার জানি না।

আপনি চিন্তা করে কোনো সমাধান বের করতে পারেন। কি না দেখুন। জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান সাধারণত খুব সহজ হয়। আমি এই ফাকে কিছু খেয়ে আসি।

তুমি রাতে কিছু খাওনি?

জি না।

যাও খেয়ে আসো।

খেয়ে আপনার এখানে আসব, না বাদলের সঙ্গে শুয়ে পড়ব?

খালুসাহেব জবাব দিলেন না। গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর বর্তমান দুশ্চিন্তা বাদলকে নিয়ে না। টেলিফোন নাম্বার নিয়ে। মাতালরা অতিদ্রুত এক দুশ্চিন্তা থেকে আরেক দুশ্চিন্তায় যেতে পারে। খেতে বসেছি। মেজো খালার বাড়িতে খাবার আয়োজন এমনিতেই ভালো থাকে, আজি আরো ভালো। বিশাল সাইজের পাবদা মাছ। ঝোল ঝোল করে রান্না করা হয়েছে। রান্নাও হয়েছে চমৎকার। ভুনা গোরুর মাংস আছে। ইলিশ মাছের ডিমের একটা ঝোলাও আছে। এই প্রিপারেশনটা দ্ৰৌপদীও জানতেন বলে মনে হয় না। খাবার মাঝখানে মোবাইল টেলিফোন বাজল। জগলু ভাইয়ের টেলিফোন। আমি টেলিফোন কানে নিয়ে বললাম, হ্যালো, জগলু ভাই।

জগলু ভাই ধমকের গলায় বললেন, তুমি কোথায়?

আমি বললাম, বাদলদের বাড়িতে।

সেটা কোথায়? অ্যাড্রেস কী?

কলাবাগানে। নাম্বার-টাম্বার তো বলতে পারব না। বাসা চিনি। অ্যাড্রেস জানি না।

আমার জিনিস কোথায়?

সঙ্গেই আছে। বাদলের খাটের নিচে রেখে দিয়েছি।

বাদল কে?

আমার খালাতো ভাই।

তুমি যেখানে আছ সেই অ্যাড্রেস জেনে নিয়ে আমাকে জানাও, আমি এসে জিনিস নিয়ে যাব।

নিজে আসবেন, না কাউকে পাঠাবেন?

একজনকে পাঠাব।

তার পাসওয়ার্ড কী?

তার মানে?

সাংকেতিক কোনো শব্দ। সে সেই শব্দ বললে আমি বুঝব যে সে আপনার নিজের লোক, তখন তার কাছে জিনিস ডেলিভারি দিয়ে দেব। যেমন পাবদা মাছ একটা পাসওয়ার্ড হতে পারে। সে গেটের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, পাবদা মাছ। ওমনি তাকে সুটকেস দিয়ে দিলাম।

তুমি কথা বেশি বলো। শোনো আমি মতিকে পাঠাচ্ছি। পাবদা মাছ, শিং মাছ কিছু না। মতিকে তুমি চেনো। চেনো না?

অবশ্যই চিনি। জগলু ভাই একটা সমস্যা আছে যে!

কী সমস্যা?

মতি ভাই আমার কাছ থেকে সুটকেস নিয়ে গেল, তারপর আপনাকে বলল, সুটকেস পেয়েছি ঠিকই কিন্তু সুটকেসে জিনিস ছিল না। জিনিস সে নিজে গাপ করে দিল। এটা হতে পারে না?

মতি আমার অতি বিশ্বাসী মানুষ।

অবিশ্বাসের কাজগুলো খুব বিশ্বাসীরাই করে।

ঠিক আছে, রাতে কাউকে পাঠাব না। সম্ভব হলে নিজেই আসব। সম্ভব না। হলে কাল দিনে অন্য ব্যবস্থা করব। রাতে মোবাইল সেট অন রাখবে।

জগলু ভাই, আরেকটা কথা ছিল।

কী কথা?

আপনি যদি পুলিশের হাতে অ্যারেস্ট হয়ে যান, তখন সুটকেসটা কী করব?

অ্যারেস্ট হব কেন?

কথার কথা বলছি। হতেও তো পারেন। আপনার ঘনিষ্ঠজনদের কেউ গোপনে পুলিশকে খবর দিল। আপনার অ্যান্টিপার্টির টাকা খেয়ে এই কাজটা তো করতে পারে। পারে না? সকালে খবরের কাগজ খুলে দেখলাম, প্রথম পাতায় আপনার ছবি। আপনার পেছনে রমনা থানার ওসি এবং সেকেন্ড অফিসার হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে একটা টেবিল। টেবিলে পিস্তল। পিস্তলের গুলি ফুলের মতো করে সাজানো। পুলিশরা পিস্তলের গুলি সব সময় ফুলের মত করে সাজায় কেন আপনি কি জানেন?

আমার সঙ্গে ফালতু কথা একেবারেই বলবে না।

জি আচ্ছা। জগলু ভাই, আপনার খাওয়াদাওয়া হয়েছে?

আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমারটা নিয়ে চিন্তা করো।

আমি হেভি খাওয়াদাওয়া করছি। বিশাল সাইজের পাবদা মাছ। আপনার যদি এখনো খাওয়া না হয়ে থাকে, চলে আসতে পারেন। ইলিশ মাছের ডিম আছে, গোরু ভুনা আছে।

চুপ স্টুপিড!

জগলু ভাই টেলিফোন রেখে দিলেন। টেলিফোন নিয়ে আমার কিছু সমস্যা আছে। টেলিফোনের কথা মনে হয়। কখনো শেষ হয় না। কিছু-না-কিছু বাকি থাকে। একবার কারো সঙ্গে কথা বললে ইচ্ছা করে আরো কারো সঙ্গে কথা বলি। কঠিন গলার কারো সঙ্গে কথা বললে সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টি গলার কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে।

মিতুকে কি টেলিফোন করব? নিশ্চয়ই এই মেয়ে এখনো ঘুমিয়ে পড়েনি। বাবার সঙ্গে কথা বলছে। মনসুর সাহেব মেয়েকে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর গল্প শোনাচ্ছেন। নিরাপদ অবস্থায় ভয়ঙ্কর গল্প শুনতেও ভালো লাগে, বলতেও ভালো লাগে। মিতুকে টেলিফোন করা আমার কর্তব্যের মধ্যেও পড়ছে। তাদেরকে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির বিষয়ে আপটুডেট রাখা দরকার। আমি টেলিফোনের বোতাম টিপলাম। ওপাশ থেকে মিতুর তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল, কে?

মিতু কেমন আছ?

কে?

গলা চিনতে পারছি না?

আপনি কে?

গলা চিনেও কে কে করছ, কেন? তুমি অতি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমার মোবাইল সেটে আমার নাম্বার উঠেছে। আমার গলার স্বরও তোমার পরিচিত। তার পরেও কে কে করেই যাচ্ছি।

আপনি চাচ্ছেন কী?

মনসুর সাহেব কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?

বাবাকে আপনার দরকার কেন?

মিতু, তুমি প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়ে দিচ্ছ কেন? বোকা মেয়েরা সবসময় প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়ে দেয়। তুমি কি বোকা?

আপনি কী চাচ্ছেন পরিষ্কার করে বলুন।

আমি তো পরিষ্কার করেই বলছি। তোমার বাবার অবস্থা কী? ডাক্তাররা তাকে কি ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন? তিনি ঘুমুচ্ছেন। তোমার বাবা কি আমার প্রসঙ্গে কিছু বলেছেন?

আপনার প্রসঙ্গে কী বলবেন?

আবারও প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন? তোমার বাবা কি বলেননি যে তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে আমার সামান্য ভূমিকা ছিল?

আপনার কোনোই ভূমিকা ছিল না। আপনি টাকার বিনিময়ে কাজটা করে এখন মহৎ সাজার চেষ্টা করছেন। টাকাটা কি জায়গামতো পৌঁছাতে পেরেছেন?

এইখানে ছোট্ট একটা সমস্যা হয়েছে। টাকা এখনো পৌঁছাতে পারিনি। আপাতত টাকাটা আমার খালাতো ভাইয়ের খাটের নিচে রাখা আছে। জগন্দু ভাই বলেছেন রাতে কিংবা সকালে এসে নিয়ে যাবেন। আমি তার কথায় সেরকম ভরসা পাচ্ছি না। আমার ধারণা, বেশ কিছুদিন সুটকেসটা আমার কাছে রাখতে হবে। ভালো কথা, সুটকেসটা কিছুদিন কি তোমার কাছে রাখতে পারি?

তার মানে?

যত্ন করে কোথাও রেখে দিলে পরে কোনো একসময় জগলু ভাইকে দিয়ে দিলাম।

আমার সঙ্গে ফাজলামি করছেন? ফাজলামি করব কেন? সুটকেসটা বাদলের খাটের নিচে রাখা নিরাপদ না। আমি যেখানে থাকি সে ঘরের দরজা লাগানোর ব্যবস্থাটা নাই।

দয়া করে আপনি আর কখনো আমাকে টেলিফোন করবেন না।

কেন?

আপনি একধরনের খেলা খেলার চেষ্টা করছেন। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি এ পার্ট টু ইট। আমাকে আর আমার বাবাকে এর মধ্যে জড়াবেন না।

জগলু ভাই যেভাবে নিজের কথার মাঝখানেই টেলিফোন কেটে দিয়েছিলেন এই মেয়েও তা-ই করল। তার নিজের কথা পুরোপুরি শেষ না করেই লাইন কেটে দিল।

বাদলের যোগব্যায়াম শেষ হয়েছে। সে সোফায় বসে আছে। তার মুখ শুকনা। চোখ বিষন্ন। সাধারণ ব্যায়ামের পর মানুষজন শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়। যোগব্যায়ামের পর হয়তো মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়। মানুষের মানসিক ক্লান্তি ধরা পড়ে চোখে।

আমি বললাম, তোর হুম-সুন শেষ?

বাদল বলল, হঁ।

ভ্যাবদা মেরে বসে আছিস কেন? সমস্যা কী?

গান বাজতে শুরু করেছে।

নে দি লদ গান?

হুঁ। কী যে যন্ত্রণা! তোমাকে যদি বোঝাতে পারতাম! ঘুমের মধ্যেও এই গান হয়। তোমাকে এইজন্যেই পাগলের মতো খুঁজছি।

আমি কী করব?

গানটা থেকে আমাকে উদ্ধার করো। গানটা মাথা থেকে বের করে দাও।

তোর জন্যে খালুসাহেব সাইকিয়াট্রিস্টের ব্যবস্থা করছেন। সাইকিয়াট্রিস্ট গান বের করে দেবেন। সাইকিয়াট্রিস্টদের হাতে নানান কায়দাকানুন আছে।

তাদের চেয়ে অনেক বেশি কায়দাকানুন তোমার হাতে আছে। তুমি ইচ্ছা করলেই আমাকে উদ্ধার করতে পার।

তোকে উদ্ধার করলে লাভ কী?

কোনো লাভ নেই?

না। তোকে এক জায়গা থেকে উদ্ধার করলে আরেক জায়গায় পড়বি।

তখন তুমি আবারও উদ্ধার করবে।

ধারাবাহিক পতন এবং ধারাবাহিক উৎখান?

হুঁ।

তোর গানটা কী আরেকবার বল তো—

নে দি লদ বা রয়াওহালা গপা…

শেষ শব্দ গপা?

হ্যাঁ গপা।

শুধু গপা না হয়ে গপাগপ হলে ভালো হতো।

ভাইজান, প্লিজ, হেল্প মি। এই গানের জন্যে আরাম করে আমি ঘুমাতে পর্যন্ত পারি না।

তোর গানের অর্থ বের করে ফেললেই গানটা মাথা থেকে দূর হবে বলে আমার ধারণা। তবে দূর হলেও লাভ হবে না, আবার অন্য কোনো গান তোর মাথায় ঢুকে পড়বে।

যখন ঢুকবে তখন দেখা যাবে। আপাতত এটা দূর করো।

তোর মাথায় একটা গানের প্রথম লাইন উলটো করে বাজছে। লাইনটা হলো, পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে। মিলিয়ে দ্যাখ।

বাদল বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। তারপর ঘোরলাগা গলায় বলল, আরো তা-ই তো! এটা তুমি কখন বের করলো? এখন?

না। যেদিন বলেছিস সেদিনই বের করেছি।

এতদিন বলনি কেন?

দরকার কী?

হিমু ভাইজান, তুমি অদ্ভুত একজন মানুষ। শুধু অদ্ভুত না, অতি অতি অদ্ভুত।

আমরা সবাই অতি অতি অদ্ভুত। তুই নিজেও অতি অতি অদ্ভুত, আবার জগলু ভাইজানও অতি অতি অদ্ভুত!

জগলু ভাইজান কে?

তুই চিনবি না। আছে একজন। নিশি মানব। মাথা থেকে গানটা গেছে?

হুঁ।

ঘুমিয়ে পড়।

আজ খুবই আরামের একটা ঘুম হবে ভাইজান।

বাদল সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমন্ত বাদলকে দেখতে ভালো লাগছে। পৃথিবীর সব ঘুমন্ত মানুষ একরকম। একজন ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে আরেকজন ঘুমন্ত মানুষের কোনো প্ৰভেদ নেই। জাগ্ৰত মানুষই শুধু একজন আরেকজনের কাছ থেকে उञाब्लाग्र হা च।

মোবাইল টেলিফোনের রিং বাজছে। জগন্নু ভাই টেলিফোন করেছেন। তিনি ঘুমিয়ে থাকলে তাঁর সঙ্গে বাদলের কোনো প্ৰভেদ থাকত না। জেগে আছেন বলেই তিনি এখন আলাদা।

জগলু ভাই, স্লামালিকুম।

জিনিস কি ঠিকঠাক আছে?

জিনিসের চিন্তায় আপনার কি ঘুম হচ্ছে না?

যা জিজ্ঞেস করেছি। তার জবাব দাও।

জিনিস ঠিকঠাক আছে, ওই যে সুটকেস দেখা যায়। ডালা খুলে দেখিব?

দরকার নাই। কাল সকালে তোমার সামনে ডালা খুলব।

জগলু ভাই, আপনি এখন আছেন কোথায়?

তা দিয়ে তোমার দরকার কী?

ঝুম বৃষ্টি পড়ছে তো, এই সময় পুত্রের পাশে শুয়ে থাকার আলাদা আনন্দ। বজ্ৰপাতের সময় বাচারা ভয় পায়। তখন হাত বাড়িয়ে বাবামাকে ছুয়ে দেখতে চায়। আপনার ছেলে নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনাকে ছয়ে দেখে না।

আমার ছেলে আছে তুমি জানো কীভাবে?

অনুমান করে বলছি জগলু ভাই। আমি কিছুই জানি না। আপনার যেবয়স এই বয়স পর্যন্ত আপনি চিরকুমার থাকবেন, তা হয় না। বিয়ে করলে ছেলেমেয়ে হবার কথা। জগলু ভাই, আপনার কি একটাই ছেলে?

হ্যাঁ।

যদি একটাই ছেলে হয়, তা হলে অবশ্যই তার নাম বাবু।

এক ছেলে হলে তার নাম বাবু হবে কেন?

হবেই যে এমন কোনো কথা নেই, তবে বেশির ভাগ সময় হয়। অতিরিক্ত আদর করে। সারাক্ষণ বাবা বাবা ডাকা হয়। সেই বাবা থেকে

বাবু।

হিমু!

জি ভাইজান?

আমার সঙ্গে চালাকি করবে না। আমি জানে শেষ করে দেব।

জি আচ্ছা।

আমার ছেলের নাম বাবু তুমি কোত্থেকে জেনেছ?

অনুমান করেছি।

আবার চালাকি! আমার সঙ্গে চালাকি? আমার ছেলের নাম কি তোমাকে মতি বলেছে?

জি না।

তোমাকে যে মোবাইল টেলিফোন দেয়া হয়েছে। সেখানে কি তার নাম এন্ট্রি করা আছে? থাকার কথা না, তার পরেও কি আছে?

জানি না জগলু ভাই।

দ্যাখো, এক্ষুনি চেক করে দ্যাখো।

কীভাবে চেক করতে হয় এটাও তো জানি না। আমি শুধু মোবাইল অন-অফ করতে জানি। আমার খালাতো ভাই বাদল এইসব ব্যাপারে খুবই পারদর্শী, তবে সে এখন ঘুমুচ্ছে।

তাকে ডেকে তোলো।

সে খুবই আরাম করে ঘুমুচ্ছে, তাকে ডেকে তোলা যাবে না।

আমি ডেকে তুলতে বলছি, তুমি তোলো।

আচ্ছা জগলু ভাই শুনুন, মনে করুন। আপনার ছেলে অসুস্থ। অনেক দিন সে আরাম করে ঘুমায় না। একবার দেখা গেল অসুখ কমেছে। সে আরাম করে ঘুমুচ্ছে। তখন কি আপনি তাকে ঘুম থেকে তুলবেন?

আমার ছেলে যে অসুস্থ এটা তুমি জানো কীভাবে?

জগলু ভাই, আমি কথার কথা বলেছি।

অবশ্যই কথার কথা না। তুমি যা বলেছ জেনেশুনেই বলেছ। এইসব তথ্য তুমি কোথায় পেয়েছ তোমাকে বলতে হবে। এক্ষুনি বলতে হবে…

জগলু ভাই হয়তো আরো অনেক কিছু বলত, হুট করে লাইন কেটে গেল। আমি টেলিফোন সেট মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাকি রাতে জগলু ভাই আর টেলিফোন করলেন না। আমি আর বাদল সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমালাম।

ঘুমের মধ্যে বাদল কোনো স্বপ্ন দেখল কি না। আমি জানি না, তবে আমি নিজে দীর্ঘ স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে আমার বাবা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কিছুক্ষণ পরপর আমার মাথা একটা চৌবাচ্চায় ড়ুবাচ্ছেন। চৌবাচ্চার পানি নাকমুখ দিয়ে ঢুকছে। ফুসফুস ফেটে যাবার মতো হচ্ছে। এর মধ্যেও তিনি অতি মধুর গলায় আমার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মাথা পানিতে ডোবানো। এই অবস্থায়ও আমি বাবার কথার জবাব দিতে পারছি। স্বপ্নে সবই সম্ভব।

বাবা বললেন, হিমালয় বাবা! কষ্ট হচ্ছে?

হুঁ।

বেশি কষ্ট হচ্ছে?

হুঁ।

স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নেবার আনন্দটা কী, এখন বুঝতে পারছিস?

পারছি।

সহজভাবে নিশ্বাস-প্রশ্বাসেই যে মহাআনন্দ এটা বুঝতে পারছিস?

পারছি। এখন ছেড়ে দাও।

আর একটু।

নিশ্বাস নিতে দাও বাবা, মরে যাচ্ছি।

আর সামান্য কিছুক্ষণ, এই তো এক্ষুনি ছাড়ব।

বাবা তুমি আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?

কষ্ট না পেলে আনন্দ বুঝবি কিভাবে?

বাবা আমি আনন্দ বুঝতে চাই না। আমি কষ্ট থেকে মুক্তি চাই।

আমি তোর শিক্ষক। আনন্দ কিভাবে পেতে হয় সেটা তোকে আমি না শেখালে কে শিখাবোরে বোকা ছেলে?

Nice Bangla Apps © 2019

Address

Dhaka

Telephone

+8801992347425

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Unique Shop BD posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Unique Shop BD:

Share