08/11/2024
জুমার বয়ান (সারাংশ): বাইতুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ।
খতীব: মুফতি আব্দুল মালেক হাফিযাহুল্লাহ।
০৮ নভেম্বর ২০২৪।
সংকলক: মুহাম্মাদ লুতফেরাব্বী আফনান
হামদ ও সানার পর বয়ানের শুরুতে তিনি মজলিসের আদব সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেন। এরপর বলেন, রাসুলুল্লাহ সাঃ তার অধিকাংশ খুতবার শুরুতে তাকওয়া বিষয়ক কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করতেন।
এরমধ্যে সুরা আলে ইমরান, নিসা, আহযাব ও হাশর অন্যতম। গত সপ্তাহে সুরা হাশরের আয়াত এবং সূরা নিসার আয়াতের কিছু অংশ আলোচনা হয়েছে।
আজকে সূরা আহযাব এর আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা জানবো ইনশাআল্লাহ।
يا ايها الذين امنوا اتقوا الله وقولوا قولا سديدا يصلح لكم أعمالكم ويغفر لكم ذنوبكم، ومن يطع الله ورسوله فقد فاز فوزا عظيما
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মুমিনদেরকে তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান দিয়েছেন, তাহলো সঠিক কথা বলা।
সঠিক কথা মানে হচ্ছে, মিথ্যার মিশ্রণ এবং ভুলের মিশ্রণ ছাড়া সঠিক সত্য কথা।
এই আদেশের ব্যাখ্যা অন্য আয়াতে এসেছে,
ولا تقف ما ليس لك به علم، إن السمع والبصر والفؤاد كل اولئك كان عنه مسؤولا.
অর্থাৎ যে বিষয়ে তোমার জানা নেই তার পিছনে পড়ো না। কারণ তোমার কান, চোখ এবং অন্তর সব বিষয়েই কেয়ামতের দিন তোমাকে প্রশ্ন করা হবে।
মানুষের কথা বলার বিধান ও পদ্ধতি কি এই দুই আয়াতে বলে দেওয়া হয়েছে।
আজকে আধুনিক সমাজে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে অন্যায় কথা, অসত্য কথা, বিকৃত কথা, বিদ্বেষ ও সম্মানহানির কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা শরীয়তের দৃষ্টিকোণে নিন্দনীয় জঘন্য কাজ।
আমি নিয়োগের পরে প্রথম জুমা পড়াইনি, তবুও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার জুমার বয়ান নামে কি আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথম জুমার দিনও যে আলোচনা করেছি তার পরিবর্তে অন্য একটি আলোচনাকে প্রথম জুমার বয়ান নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার নামান্তর।
অনেকে ভাবতে পারে আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে শরীয়তের কোন নীতিমালা নেই। অথচ সাড়ে ১৪০০ বছর আগে এ সকল বিধান কোরআন এবং সুন্নাহয় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কর্তব্য হলো, যখন যে সমাজে যে অবস্থা ও পরিস্থিতি আসে তার বিধান ও নীতিমালা কোরআন এবং সুন্নাহ থেকে জেনে নেওয়া।
কোন কথা শেয়ার করার বিধান কি?
যেকোনো কথা পেলেই বা তথ্য জানলেই তা অন্যদেরকে জানিয়ে দেওয়া বা শেয়ার করা মুমিনের আলামত নয়, এটি মিথ্যাবাদী হওয়া, গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। হাদিসে এই বিষয়ে কঠিন নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
বরং এক্ষেত্রে মূলনীতি হল..
১- তথ্যসূত্র যাচাই করা।
২- তথ্যের বিষয়বস্তুর সত্যতা ও বিশুদ্ধতা যাচাই করা।
৩- সঠিক ও বিশুদ্ধ হলেও তথ্যটি সাধারণ জনগণের জন্য উপকারী কিনা তা বুঝা।
৪- যদি কোন বিশেষ আমানতের তথ্য থাকে, তবে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে না জানানো।
যদি সত্যিকার অর্থেই কোন বিষয় সকলের জন্য উপকারী হয় তাহলে তা শেয়ার করা অন্যথায় চুপ থাকা।
হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন তম কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। কারণ চুপ থাকলে তার সওয়াব না হলেও গুনাহ হবে না।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, যার যে বিষয়ে জ্ঞান নেই,পাণ্ডিত্য নেই, বিশেষজ্ঞতা নেই, সে যেন সেই বিষয়ে কোন কথা না বলে না লিখে।
আরেকটি হাদিসে এই বিষয়ে গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলা হয়েছে, المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده অর্থ: মুসলিম হলো ওই ব্যক্তি যার জিহবা ও হাত থেকে মুসলমানগন নিরাপদ থাকে।
এই জিব্বা আকৃতিতে ছোট কিন্তু তার অপরাধ অনেক বড়। আজকের আধুনিক যুগে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ মাধ্যমে এই জিহবা ও হাত দ্বারা অনেক রকম অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। মোবাইলে টাচ করা হোক, কম্পিউটারে কিবোর্ডে লেখা হোক, বা মুখেও মাইকে আলোচনা করা হোক সকল ক্ষেত্রেই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ সময় জুমার আদব সম্পর্কে বলেন,
জুমার দিন অনেকেই ধাক্কাধাক্কি করে, সামনে আসার জন্য অন্যদেরকে কষ্ট দেয়, এটি গুনাহের কাজ। বিদায় হজের সময় আল্লাহর রাসূল বলেছিলেন لا طرد ولا اذا إيذاء মানে কাউকে ধাক্কা দিও না কষ্ট দিওনা। বিশেষ করে কোন একজন বিশেষ ব্যক্তিকে সম্মান দেওয়ার জন্য বা এগিয়ে নেওয়ার জন্য রাস্তা ফাঁক করতে যেয়ে অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা ধাক্কা দেওয়া নিন্দনীয় কাজ।
একবার একটি রাসূলুল্লাহর মজলিসে মানুষকে ডিঙিয়ে আসছিল তখন তিনি তাকে বলেছেন اجلس فانك آذيت وآنيت। তুমি যেখানে আছো সেখানে বসে পড়ো, তুমি দেরিতে এসে আবার মানুষকে কষ্ট দিচ্ছ। এজন্য এগুলো আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
يصلح لكم أعمالكم ويغفر لكم ذنوبكم
মানুষ যখন তার অন্তরে আল্লাহকে ভয় করবে এবং সঠিক ও সত্য কথা বলবে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং এবং তাঁর আমলকে সুন্দর করে দিবেন।
এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ومن يطع الله ورسوله فقد فاز فوزا عظيما
যে আল্লাহকে এবং তার রাসূলকে অনুসরণ করবে সে সফলকাম হয়ে গেল।
আল্লাহকে অনুসরণ করার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করত: আল্লাহর আদেশকৃত সকল বিধানকে মানা এবং সকল নিষেধকৃত কাছ থেকে বিরত থাকা।
রাসূলকে অনুসরণ করার অর্থ হচ্ছে, রাসুলের সুন্নাহকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করা।
আজকে এই সময় এই শহরে এই সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা হাদিসকে অনুসরণ করতে চায় না মানতে চায় না। অথচ রাসুলের হাদিসকে অস্বীকার করা সুন্নাহকে অস্বীকার করা রসূলকে অবমাননার নামান্তর। রাসুলের সুন্নাহকে অস্বীকার করলে এবং তাকে শরীয়তের বিধান মনে না করলে তার ঈমান থাকবে না।
কেউ যদি সুন্নতের পরিবর্তে বিদাতকে গ্রহণ করে, অথবা সুন্নত পরিপন্থী কোন মতাদর্শ লালন করে তাহলে সে প্রকৃত রাসুলের অনুসারী হবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমাদের জবান ও হাতকে হেফাজত করে উত্তম কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ অনুসারি হওয়ার তাওফিক দান করুন। .....
জুমার আরবি খুতবাতে উপরোক্ত আলোচনার সারাংশ হৃদয়গ্রাহী আরবীতে উপস্থাপন করেন।
নামাজের পরে দোয়াতে সারা পৃথিবীর ইসলাম ও মুসলমানের জন্য , বাংলাদেশের সকল মানুষের শান্তি সমৃদ্ধি সুস্থতা ও ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্য দোয়া করেন।
দাওয়াত, তালিম, তাজকিয়া, জি.হা.দ ফি সা.বিলি.ল্লাহ সহ দ্বীনের সকল শাখার মানুষের মাঝে অনৈক্য ও অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থেকে মহাব্বত, ইকরাম ও ঐক্যের সাথে কাজ করার জন্য দোয়া করেন।
সংকলিত।