28/05/2024
সুলতানুল আরেফিন হযরত শাহ জালাল ইয়ামেনী (র.)
……………………………………….
ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী
……………………………………….
ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি-সাধক, সুলতানুল আরেফিন, কুতুবে আলম, শায়খুল মাশায়েখ, শাহ হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি মুজারেরদি (রহ.) ৬৭১ হিজরী এবং ১২৭১ খিৃস্টাব্দে তুরস্কে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পুরো নাম শায়খ শাহজালাল কুনিয়াত মুজাররদ। তাঁর পিতার নাম হযরত শেখ মুহাম্মদ তাবরিজী (রাঃ)। তিনি একজন কোরাইশ বংশীয় স্বনামধন্য খ্যাতিমান দরবেশ ছিলেন। তিনি প্রখ্যাত দরবেশ হযরত আবু সাঈদ তাবরিজীর মুরীদ ও খলিফা ছিলেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) এঁর মত বুজুর্গ ব্যক্তি হযরত আবু সাঈদ তাবরিজী (রাঃ) এঁর ফয়েজ হাসিল করেন।
হযরত শাহ জালাল (র.) ৭০৩ হিজরী মোতাবেক ১৩০৩ ইংরেজী সালে ৩২ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে এসেছিলেন বলে ধারনা করা হয়। সিলেট আগমনের সময় কাল নিয়ে যদিও বিভিন্ন অভিমত রয়েছে; তদুপরি শাহজালালের সমাধির খাদিমগণের প্রাপ্ত পারসী ভাষার একটি ফলক লিপি হতে উল্লেখিত সন-তারিখই সঠিক বলে ধরা হয়। পারসী ভাষায় লিখিত ফলক লিপি বর্তমানে ঢাকা যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সিলেটে তাঁর মাধ্যমেই ইসলামের বহুল প্রচার ঘটে। সিলেট বিজয়ের পরে শাহ জালালের সঙ্গী অনুসারীদের মধ্য হতে অনেক পীর দরবেশ এবং তাদের পরে তাদের বংশধরগণ সিলেট সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বসবাস করেন। শাহজালাল ও তাঁর সফরসঙ্গী ৩৬০ জন আউলিয়ার সিলেট আগমন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে সিলেটেই কবর দেয়া হয়। হযরত শাহজালাল (রহ.) ৭৪০ হিজরী এবং ১৩৪১ খিৃস্টাব্দে শাহাদাত বরণ করেন।
প্রাথমিক জীবন
হিজরী ষষ্ঠ শতকের শেষাংশে মক্কার কোরায়েশ বংশের একটি শাখা মক্কা শহর হতে হেজাজ ভূমীর দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তে ইয়েমেন প্রদেশে গিয়ে বসবাস করেন। ঐ শাখার মোহাম্মদ বা মাহমুদ শাহজালালের পিতা। মাহমুদের পিতার নাম ইব্রাহিম। হযরত শাহ জালালের রওজায় প্রাপ্ত ফলক লিপি সুহেলি ইয়্যামনি অনুসারে শাহ জালাল ৩২ বছর বয়সে ৭০৩ হিজরী মোতাবেক ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট আগমন করেন। সুহেলি ইয়্যামনিতে উল্লেখিত তথ্য হতে জানা যায় যে, ৬৭১ হিজরী - ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে শাহজালাল জন্ম গ্রহন করেছেন। তাঁর জন্ম ভূমি ছিল প্রাচীন আরবে আযমের হেজাজ ভূমির তৎকালীন প্রদেশ ইয়্যামন দেশের কুনিয়া নামক শহর। শাহ জালাল যখন তিন মাসের শিশু বালক, তখই তাঁর মাতার মৃত্যু হয়।
শাহ জালাল শিশু কালেই মাতৃহীন হন এবং পাঁচ বছর বয়সে পিতাকে হারান। মামা আহমদ কবির তাঁকে পালক নেন। আহমদ কবির আরবী ভাষায় কোরআন হাদিস শিক্ষা দেয়া সহ ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক বিষয়ে (নামজ, রোজায়) অভ্যস্ততার জন্য গুরুত্ব প্রদান করেন। পরবর্তিতে আহমদ কবীর শাহ জালালকে ইয়েমেন থেকে মক্কায় নিয়ে যান। মক্কা শহরে আহমদ কবীরের একটি আস্তানা (হোজরা) ছিল। সেখানে অন্যান্য শিষ্যদের সাথে শাহ জালালকেও উপযুক্ত শিক্ষা দিয়া গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন বলে জানা যায়।
আধ্যাত্নিকতা
শাহ জালালকে সুফি মতবাদে দীক্ষিত করাই আহমদ কবিরের মুল উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা যায়। যে কারণে আহমদ কবিরের শাহ জালালকে নিয়ে মক্কায় আসা। মক্কা শহরে সোহরাওয়ার্দি তরিকার প্রবর্তক সিহাবুদ্দীনের প্রতিষ্টিত খানকায় (মরমী স্কুল) তত্কালে আহমদ কবির ছিলেন প্রধান তত্ত্ববধায়ক। আহমদ কবির শাহ জালালকে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারায় শিক্ষা দানে দীক্ষিত করেন।
দরবেশী জীবন
জন্ম গত ভাবে শাহ জালাল দরবেশ পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। জানা যায়, তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধর্মানুরাগী মোজাহিদ, ইয়্যামনে ধর্ম যুদ্ধে তিনি নিহত হন এবং তার মাতার দিক দিয়ে তিনি সৈয়দ বংশের প্রখ্যাত দরবেশ সৈয়দ জালাল সুরুখ বোখারীর দৌহিত্র ছিলেন। তদুপরি দরবেশ আহমদ কবির তাঁর মামা, যাঁকে শাহ জালালের শিক্ষা গুরু হিসেবে পাওয়া যায়, তিনিও তত্কালের একজন বিখ্যাত দরবেশ ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। আহমদ কবির যখন শাহ জালালের লালন পালনের ভার গ্রহন করেন সেই ছোট বেলা থেকেই তাঁকে দরবেশী তর-তরিকায় জীবন যাপনের প্রণালি শিক্ষা দিয়েছন বলেও পাওয়া যায়।
সিলেট আগমন পর্ব
শাহ জালাল মুজাররদ তাঁর মামা ও গুরু সৈয়দ আহমদ কবিরের আস্তানায় আরব দেশে ছিলেন। শাহজালাল ভারতবর্ষে ধর্ম প্রচারের স্বপ্ন দেখার পরে সৈয়দ আহমদ কবির এর কাছে ব্যক্ত করেন। মামা ও মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবিরকে তা জানান। কবির এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে শাহজালালকে ভারতবর্ষে যাবার পরামর্শ দেন। যাত্রাকালে কবির শাহ জালালেরর হাতে এক মুঠো মাটি তুলে দিয়ে বললেনঃ যে স্থানে এই মাটির "স্বাদ" "গন্ধ" ও "বর্ণের" মিল এক হবে, সেখানেই ধর্ম প্রচারের জন্য আস্তানা গড়বে। মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবির (রহ) এর দোয়া লয়ে শাহ জালাল (রহ) ধর্ম প্রচার অভিযানে আরবের মক্কা শরিফ হতে একা একাই যাত্রা শুরু করেন।
হিন্দুস্থানে প্রবেশ
শাহ জালাল মক্কা হতে বিদায় কালে যে কয়েক জন সঙ্গী তাঁর সাথে যাত্রা করেন তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হাজী ইউসুফ, হাজী খলীল, হাজী দরিয়া এবং আরেক জন সঙ্গীর নাম চাশনী পীর তিনি ছিলেন মৃত্তিকার তহবিলদার। হিন্দুস্থানে আসার পূর্ব পর্যন্ত সমরবান্দ থেকে সৈয়দ ওমর, রোম থেকে করিমদাদ, বাগদাদ থেকে নিজাম উদ্দীন, ইরান, জাকারিয়া ও শাহ দাউদ এবং সৈয়দ মুহম্মদ প্রমুখ তার অনুগামী হলেন। তাদের নিয়ে তিনি হিন্দুস্থানে প্রবেশ করলেন। এরপর সুলতান থেকে আরিফ, গুজরাট থেকে জুনায়েদ, আজমীর শরীফ থেকে মুহম্মদ শরীফ, দাক্ষিণাত্য থেকে সৈয়দ কাসিম, মধ্যপ্রদেশের হেলিম উদ্দীন প্রমুখ তার মুরীদ হয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চললেন। এভাবে দিল্লী পর্যন্ত এসে পৌছলেন তখন শিষ্যদের সংখা ২৪০ জন বলে ধারণা পাওয়া যায়।
হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার সাথে সাক্ষাত
দিল্লিতে আসার পর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জৈনক শিষ্য গুরুর কাছে শাহ জালালের কুত্সা প্রচার করে । সঙ্গে সঙ্গে নিজাম্মুদ্দীন অন্যের কুত্সা রটনাকারী এ শিষ্যকে উপযুক্ত সাস্তি স্বরুপ দরবার থেকে তাড়াইয়া দিলেন এবং অন্য দুই শিষ্যকে ডেকে তাদের মারফতে শাহ জালালের কাছে সালাম পাঠালেন । শাহ জালাল সালামের উত্তরে উপটৌকন স্বরুপ ছোট একটি বাক্সে প্রজ্জলিত অঙ্গারের মধ্যে কিছু তুলা ভরিয়া নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নিকট পাঠালেন। নিজামুদ্দিন আউলিয়া হযরত শাহ্ জালালের আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে সাদরে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানান। বিদায়কালে প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁকে এক জোড়া সুরমা রঙের কবুতর উপহার দিলেন। মাজার সংলগ্ন এলাকায় সুরমা রঙের যে কবুতর দেখা যায় তা ঐ কবুতরের বংশধর। যা জালালী কবুতর নামে খ্যাত।
শেখ্ বুরহান উদ্দীনের দেখা ও দুঃখ প্রকাশ:
উল্লেখ্য যে, শ্রীহট্টে ইসলাম জ্যোতি সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণনা অনুসারে তুর্কি বিজয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীহট্টে মোসলমান জন বসতি গড়ে ওঠে ছিল । সিলেটের টুলটিকর মহল্লায় ও হবিগঞ্জের তরফে তত্কালে মোসলমানরা বসতির গড়ে ছিলেন। এ সময় শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে গৌড়-গোবিন্দ নামে এক অত্যাচারি রাজা ছিল। গৌড় রাজ্যের অধিবাসী বুরহান উদ্দীন নামক জৈনক মোসলমান নিজ ছেলের জন্ম উত্সব উপলক্ষে গরু জবাই করে গৌড়ের হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দের কাছে অপরাধি সাবস্ত হন। ফলে গোবিন্দ বুরহান উদ্দীনের শিশু ছেলেকে ধরে নিয়ে হ্ত্যা করে। বুরহান উদ্দীন বাংলার তত্কালীন রাজা শামস উদ্দীন ফিরুজ শাহের নিকট গিয়ে এই নিষ্ঠুর হ্ত্যা কাণ্ডের অভিযোগ করলে রাজা তাঁর ভাগিনে সিকান্দর গাজীকে প্রখণ্ড সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে প্রেরণ করেন। শাহী সৈন্য যখন ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতে চেষ্টা করে তখনই রাজা গোবিন্দ ভোতিক শক্তির সাহায্যে মুসলিম সৈন্যের উপর অগ্নীবাণ নিক্ষেপ করে সমস্ত চেষ্টাকে বিফল করে ফেলে। গোবিন্দের ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রভাবে সিকান্দর গাজীর প্রতিহ্ত ও বিফল মনোরথের সংবাদ দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নিকট পৌছলে সম্রাট এ সংবাদে মর্মাহত হন।
পরবর্তিতে সম্রাট তাঁর রাজদরবারী আমেল-উলামা সহ জ্যোতিষদের সাথে আলোচনায় এই মর্মে অবহিত হন যে, সুলতানের সেনাবাহিনীতে আধ্যাতিক শক্তি সম্পন্ন এক ব্যক্তি রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করা হলে গৌড়গোবিন্দের যাদু বিদ্যার মোকাবেলা করে সিলেট বা শ্রীহট্ট জয় সম্ভব হবে। জ্যোতিষিরা উক্ত আধ্যাতিক শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তির পরিচয়ের পন্থা হিসেবে এও বলে ছিল, আগামী দুই/এক রাত্রের মধ্যে দিল্লী নগরীতে প্রখণ্ড ঝড় বৃষ্টিতে সমস্ত নগরী ভেসে যাবে, প্রতিটি ঘর বাড়ির বিষম ক্ষতি লক্ষিত হবে, কোথায় কোন প্রদিপ থাকবেনা একটি মাত্র তাবু ব্যতিত। সম্রাট জ্যোতিষদের কথামত অনুসন্ধান করে সেই ঝড় বৃষ্টির রাতে দেখতে ফেলেন এক জন সাধারণ সৈনিক একটি তাবুতে একাগ্র মনে বসে কোরান পড়রছেন। সম্রাট সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁর সব বিষয় অবগত হয়ে সিলেট অভিযানের নেতৃত্ব দেয়ার অনুরুধ জানান। তিনি সৈয়দ নাসির উদ্দীন সম্রাটের আদেশে সম্মত হলে সম্রাট তাঁকে সিপাহসালার সনদ প্রদানের মাধ্যে সিকান্দর গাজীর কাছে প্রেরণ করেন। এ দিকে গাজী বুরহান উদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করতেছেন। এ সময় শাহ জালালও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে দিল্লীতে আসেন । ঐতিহাসিক আজহার উদ্দীন ধরণা করে দিল্লীতেই বুরহান উদ্দীনের সাথে শাহ জালালের সাক্ষাত হয় এবং এখানেই বুরহান উদ্দীন নিজের দুঃখময় কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন।
সিপাহশালার নাসির উদ্দীনের দেখা
শাহ জালাল দিল্লী হতে বুরহান উদ্দীনকে সহ ২৪০ জন সঙ্গীসহচর সিলেটের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলেন । শাহ জালাল সাতগাও এসে ত্রিবেণীর নিকট দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনের সাথে মিলিত হন। সৈয়দ নাসির উদ্দীন শাহ জালাল সম্পর্কে অবগত হয়ে তদীয় শিষ্যত্ব গ্রহনের অভিপ্রা ব্যক্ত করেন। পথে পথে শাহ জালালের শিষ্য বর্ধিত হতে লাগল । ত্রিবেনী থেকে বিহার প্রদেশে আসলে আরো কয়েকজন ধর্ম যুদ্ধা অনুসঙ্গী হলেন। যাদের মধ্যে হিসাম উদ্দীন, আবু মোজাফর উল্লেখযোগ্য। এখান থেকে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনের আনিত একহাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্য সহ শাহ জালাল নিজ সঙ্গীদের নিয়ে সোনার গাঁ অভিমুখে সিকান্দর গাজীর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
সিকান্দর গাজীর দেখা ও ব্রহ্মপুত্র পার
শাহ জালাল সোনার গাঁ আসা মাত্রই শাহ সিকান্দর গাজীর সাথে সাক্ষাত ঘটিল। সিকান্দর গাজী শাহ জালালকে সসম্মানে গ্রহন করলেন । শাহ জালাল তাঁর সঙ্গী অনুচর ও সৈন্য সহ শাহ সিকান্দরের শিবিরে সমাগত হয়ে সিকান্দর হতে যুদ্ধ বিষয়ে সব বিষয় অবগত হন। সিকান্দর শাহ জালালের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্য গ্রহন পুর্বক সিলেট অভিমুখে যাত্রা করলেন । এভাবে শাহ জালালের শিষ্য সংখ্যা ৩৬০ জনে পৌছে। এ দিকে গৌড় গৌবিন্দ নিজেস্ব চরদ্বারা শাহ জালালের সমাগম সংবাদ পেয়ে নতুন এ দল যাতে ব্রহ্মপুত্র নদী পার না হতে পারেন, সে ব্যবস্থা অনুসারে নদীর সমস্ত নৌ চলা-চল বন্ধ করে দেয় । শাহজালালের ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বিনা বাধায় জায়নামাজের সাহয্যে ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন।
সিলেটে প্রবেশ
খ্রিস্টিয় দশম শতকে শ্রীহট্ট ভুমী লাউড়, জয়ন্তীয়া ও গৌড় নামে তিনটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। উক্ত রাজ্য গুলোর মধ্যে গৌড় অন্যতম রাজ্য হিসেবে বিবেচিত ছিল। এ রাজ্যে প্রাচীন সীমা রেখা বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা সহ হবিগঞ্জ জেলার কিয়দাংশ নিয়ে বিস্তৃত থাকায় গৌড় রাজ্যের দহ্মিণ সীমাভুমী নবীগঞ্জের দিনারপুর পরগণার পাশে রাজা গোবিন্দের চৌকি ছিল। শাহ জালাল তাঁরসঙ্গীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে প্রথমত সেখানে অবস্থান করেন। এখানে গৌড়ের সীমান্ত রক্ষীরা অগ্নীবাণ প্রয়োগ করে তাদেরকে প্রতিহত করতে চায় । কিন্তু মুসলমান সৈন্যের কোন ক্ষতি করতে পারে নাই । গোবিন্দ সমস্ত বিষয় অবগত হয়ে উপায়ন্তর না পেয়ে বরাক নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ বলে ঘোষনা জারি কর। শাহ জালাল পুর্বেরমত জায়নামাজের সাহায্যে বরাক নদী পার হন। বরাক নদী পারা-পারে বাহাদুরপুর হয়ে বর্তমান সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলায় ফতেহ পুর নামক স্থানে রাত্রি যাপন করেন। উল্লেখিত তথ্য সম্মেলিত প্রাচীন গ্রন্থ তোয়ারিখে জালালীতে উল্লেখ আছেঃ
চৌকি নামে ছিল যেই পরগণা দিনারপুর
ছিলটের হর্দ্দ ছিল সাবেক মসুর
সেখানে আসিয়া তিনি পৌছিলা যখন
খবর পাইলা রাজা গৌবিন্দ তখন ।
এপারে হজরত তার লস্কর সহিতে
আসিয়া পৌছিলা এক নদীর পারেতে
বরাক নামে নদী ছিল যে মসুর
যাহার নিকট গ্রাম নাম বাহাদুরপুর।
যখন পৌছিলা তিনি নদীর কেনার
নৌকা বিনা সে নদীও হইলেন পার।
সর্ব প্রকার কল-কৌশল অবলম্বন করে রাজা গৌড়-গোবিন্দ যখন দেখলেন সকল প্রয়াসই বিফল হচ্ছে, তখন শেষ চেষ্টা করার লক্ষে যাদু মন্ত্র সহ এক প্রকাণ্ড লৌহ ধুনুক শাহ জালালের কাছে প্রেরণ করে । যার শর্ত ছিল যদি কেহ একা উক্ত ধনুকের জ্যা ছিন্ন করতে পারে তখন গোবিন্দ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে। শাহ জালাল তাঁর দলের লোকদের ডেকে বললেন; যে ব্যক্তির সমস্ত জীবনে কখনও ফজরের নামাজ খাজা হয় নাই বা বাদ পরে নাই একমাত্র সেই পারবে গোবিন্দের লৌহ ধনুক "জ্যা" করতে। অতপর মুসলিম সৈন্য দলের ভেতর অনুসন্ধান করে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনকে উপযুক্ত পাওয়া গেল এবং তিনিই ধনুক জ্যা করলেন।
সুরমা নদী পারাপার
উত্তর পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়ে যায়। সিলেট বিভাগের বেষ্টনী হিসেবে ধর্তব্য এ নদী গুলো প্রাচীন কালে প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হত। বর্ষাকালের দৃশ্য প্রায় সাগরের মত দেখাত। ঐতিহাসিক পর্যটক ইবন বতুতা সুরমা নদীকে নহরি আজরফ বলে আখ্যায়িত করেছেন । শাহ জালাল ফতেপুর হতে যাত্রা করে যখন সুরমা তীরে অবস্থান নিলেন। এ নদী পার হয়েই গৌড়ের রাজধানী। শাহ জালাল আউলিয়ার কেরামতি ও আলৌকিক বিভিন্ন ঘটনায় রাজা গোবিন্দ বীতশ্রদ্ধ হন। গোবিন্দ শক্রবাহিনীকে কিছু সময় ঠেকিয়ে রাখার জন্য সুরমা নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ করেন। তা সত্ত্বেও শাহ জালাল নদী পার হন। শাহ্ জালাল বিসমিল্লাহ বলে সকল মুরিদকে নিয়ে জায়নামাজে করে,
অনায়াসে গেলেন চলে নদীর ওপারে।
গোবিন্দ গড়দুয়ারস্থিত রাজবাড়ি পরিত্যাগ করে পেচাগড়ের গুপ্ত গিরি দুর্গে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তার আর কোন হদিস মেলেনি। শাহ জালাল তিন দিন সিলেটে অবস্থান করার পর, মিনারের টিলায় অবস্থিত রাজবাড়ি প্রথমে দখল নিলেন।
সিলেট বিজয়
সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের আমলে ৭০৩ হিজরীতে শাহ্জালাল ইয়েমেনী আধ্যাত্মিক শক্তির সাহায্যে সিলেট বিজয় করেন। বর্ণিত আছে যে গৌড় গোবিন্দ কর্তৃক শেখ বুরহানুদ্দীনের শিশু পুত্র হত্যার প্রতিবিধানার্থে প্রেরিত সিকান্দার গাজীর বাহিনী গৌড় গোবিন্দের ঐন্ত্রজালিক ক্ষমতার কারণে বারবার পরাভুত হয়। অবশেষে হযরত শাহ্জালাল(রঃ) ও তাঁর অনুসারী ৩৬০ আউলিয়া সহযোগে গৌড় গোবিন্দের ঐন্ত্রজালিক ক্ষমতাকে পরাভূত করে সিলেট বিজয় করা হয়।
রিয়াযত ও সাধনা
হযরত শাহ্জালাল (রঃ) ছিলেন ইবাদত ও রিয়াযত- সাধনার এক বিস্ময়কর প্রতিক। তিনি সায়েমুদ্দহর ও কায়েমুললাইল ছিলেন অর্থাৎ নিষিদ্ধ দিন ব্যতীত সারা বছর দিনে রোজা রাখতেন এবং রাতে ইবাদতের হক আদায় করতেন।
বর্ণিত আছে যে, তিনি কোন রাত্র কিয়ামের জন্য, কোন রাত রুকু, কোন রাত সিজদার জন্য নির্দিষ্ট করে নিতেন । নিম্নে তাঁর ইবাদত ও রিয়াযত-সাধনার কয়েকটি ঐতিহাসিক বর্ণনা তুলে ধরা হলঃ ইবনে বতুতা বর্ণনা করেন,তিনি (শায়খ জালাল) ৪০ বৎসর হতে বরাবর রোযা রাখতেছিলেন। দশ দিন অন্তর তিনি ইফতার করতেন । তাঁর শরীর ছিল কৃশকায়-পাতলা, আকৃতি ছিল লম্বা গন্ডদ্বয় ছিল ক্ষীণ। ইবনে বতুতা আরো বলেন ,সে দেশের হিন্দু মুসলমান সকলে শায়খের দর্শনের জন্য আসত এবং তাঁকে ভেট(নযরানা) প্রদান করত। তা ফকির ও কাঙাল সকলেই খেত কিন্তু শায়খ কেবল একটি গরুর দুধ পান করতেন।
ডঃ জে,ওয়াইজ Notes on Shahjalal the patron saint of Sylhet গ্রন্থে উলেৱখ করেন সুহেল-ই- ইয়ামন গ্রন্থে বর্নিত আছে, for thirty years Shah Jalal is said to have lived in a cave without Crossing the threshold.”
ইসরারুল আউলীয়ায় বর্ণিত আছে যে, শায়খ ফরিদউদ্দিন শকরগঞ্জ (রাঃ)
বলেন, শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিযী(রাঃ অধিকাংশ সময় অনাহারে থাকা সত্বেও কারো নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করতেন না। একবার তিন দিন পর্যন্ত তাঁহার নিকট কিছুই ছিল না । তিনি ও তাঁর সাথীগণ তরমুজ দ্বারা ইফতার করেন । তথাকার (বদায়ুন) শাসনকর্তা এই সংবাদ পেলেন এবং এ কথাও জানতে পারলেন যে তিনি কারও দান-দক্ষিণা গ্রহন করেন না । তাই একজন লোক দ্বারা কিছু আশরফি শায়খের খাদিমের নিকট এ বলে পাঠালেন, যেভাবে ইচ্ছা খরচ কর কিন্তু শায়খ যেন জানিতে না পারেন কোথা হতে এই খরচ হইতেছে। খাদিম ইহা গোপন রাখা পছন্দ করলেন না।তিনি শায়খের কাছে সকল কথা খুলিয়া বললেন। শায়খ জিজ্ঞাসা করিলেন - সেই লোক কিভাবে আসলো এবং কোথায় কোথায় তার পা পড়েছিল? খাদিম সব দেখিয়ে দিলেন, শায়খ বললেন- সেই ব্যাক্তি যেখানে যেখানে পা রেখে এসেছে তথাকার মাটি খুঁড়ে আশরাফি গুলি বাইরে ফেলে দাও।
হযরত শায়খ জালাল (রাঃ) শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর শিষ্যত্বে ছিলেন সাত বছর। বর্ণিত আছে শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রাঃ) প্রতি বছর বাগদাদ হতে পদব্রজে হজ্বে গমন করতেন। বার্ধক্যের জন্য তিনি ঠান্ডা খাবার হজম করতে পারতেন না। গরম খাদ্য পরিবেশনের জন্য শায়খ জালাল (রাঃ) মাথায় একটি জ্বলন্ত চুলা বহন করতেন। বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত গরম খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতেন। এ প্রসঙ্গে ইসরারুল আউলিয়া গ্রন্থে শায়খ ফরিদউদ্দীন শকরগঞ্জ (রঃ) বর্ণনা করেন, শেখ জালালুদ্দীন তাবরিযি তাহাঁর পীর বাহাউদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর এতটাই সেবা করতেন যে অন্য কোন মুরীদ এতটা করতেন না। একদা তিনি জ্বলন্ত চুলা মাথায় করে যাচ্ছিলেন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, হজ্বে । তাঁর খিদমতের পদ্বতি দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম - কতদিন যাবৎ তিনি এইভাবে পীরের খেদমত করছেন? তারা বলিলেন, পঁচিশ বৎসর যাবত আমরা এমনই দেখছি।
হযরতের বুযুর্গী
হযরত শায়খ শাহ্ জালাল ইয়েমেনী (রঃ) এঁর বুযুর্গী ও কামালাত সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালাই উত্তম অবগত। আমরা কয়েকটি ঘটনা ও মনীষীর উক্তি তুলে ধরছি। হযরত শায়খ জালালুদ্দীন যখন তাঁর মামা সৈয়দ আহমদ কবির (রাঃ) এঁর তত্তাবধানে ছিলেন তখন মামার মনোভাব অনুসারে একটি বাঘের যথাযথ উপযুক্ত বিচার সম্পন্ন করার পর সৈয়দ আহমদ কবির (রঃ) বললেন জালাল সুমা বকামাল রছিদি। অর্থাৎ জালাল তুমি আত্ম উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। ফাওয়ায়েদুল ফওয়াদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, একবার শায়খ শিহবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী মক্কা শরীফ হতে আসার পথে ভক্তগন তাঁকে অনেক নজর- নেয়াজ প্রদান করলেন। এক গরিব বৃদ্ধাও হযরতকে একটি দিরহাম প্রদান করলেন। তিনি তাঁর সাথী দরবেশগণ কে প্রাপ্ত দ্রব্য সামগ্রী থেকে নিতে আদেশ দিলেন এবং সকলেই নিজের ইচ্ছামত সামগ্রী উঠিয়ে নিলেন। হযরত শায়খ জালাল কিছুই নিলেন না। শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রাঃ) কিছু নিতে বললে শায়খ জালাল গরিব বৃদ্ধার দেওয়া দিরহামটি উঠিয়ে নিলেন। তা
দেখে শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রঃ) বললেন, জালালুদ্দীন! বাহ্যত যদিও তুমি একটি দিরহাম গ্রহণ করলে যাহা সকলের চোখেই নগন্য কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তুমি এমন জিনিস গ্রহণ করলে যা ওই সকল মূল্যবান দ্রব্যাদির আত্মা স্বরূপ তুমি অন্যান্যদের জন্য কিছুই রাখিলেনা চতুর্দশ শতকের বিশখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমন বৃত্তান্তে হযরত শাহ্জালাল (রঃ) কে কেন্দ্র করে লিখেন, অলিয়্য মিনাল আউলিয়া বা আউলিয়াদের ওলি, মিনাল কুবারুল আউলিয়া বা শ্রেষ্ঠ আউলিয়াগনের অন্যতম, মাসিরাল আযিমা বা মহান নির্দেশনাবলির স্থাপয়িতা ও আফরাদুর রিজাল বা মানুষের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে বতুতার বর্ণনায় আরো জানা যায় যে , চীনের বিখ্যাত সূফী সাধক শায়খ বুরহানউদ্দীন সাগরজী (রাঃ) প্রসঙ্গক্রমে বলেন , আমার ভাই শায়খ জালালুদ্দীন এঁর পদবী ইহা অপেৰা অনেক উর্ধ্বে। সংসারের সমস্ত ব্যাপারে তাঁর অধিকার আছে। তিনি আরো বলেন, আমি জানি তিনি প্রত্যেক দিন ফজরের নামায মক্কা শরীফে পড়তেন এবং প্রত্যেক বছর হজ্ব পালন করতেন। তিনি আরাফা এবং ঈদের দিনে অদৃশ্য হয়ে যেতেন কারো কোন খবর হতো না। এছাড়াও ওই সময়ের বিভিন্ন শিলালিপিতে খোদিত আছে, জালালুদ্দীন জালালুলৱাহ আরিফান বুয়দ। অর্থাৎ জালালুদ্দীন আল্লাহর দ্বীপ্তি এবং আরেফগণের গৌরব। জালালুদ্দীন কুতুব বুয়দ অর্থাৎ জালালুদ্দীন কুতুবগনের সুঘ্রাণ। সাকিন আউজ জান্নাত ওয়ালা অর্থাৎ বেহেস্তে তাঁর স্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাজ জীবনে হযরতের প্রভাব
হযরত শাহ্জালাল (রাঃ) প্রেমময় দ্বীনের যে প্রদীপ শিখা আল্লাহ্র হুকুমে এ বংগ অঞ্চলে জ্বালিয়েছেন তাঁর আলোয় কত যে অসংখ্য অন্ধকার হৃদয় আলোকিত হয়েছতা আল্লাহ্ তায়ালাই ভাল জানেন। বস্তুত তিনি নিজেই
আলোক শিখা। তাঁর আলোয় আলোকিত পুরো বংগ অঞ্চল। এ দেশের জনগণের
ধর্মীয়, সামাজিক ,রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনে, লোক সাহিত্যে, ধ্র্বপদী সাহিত্যে, শিক্ষা,সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সব ক্ষেত্রেই হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রাঃ) এঁর প্রভাব পাওয়া যায়। চিশতিয়া ত্বরিকার বুযুর্গগনের মালফুযাত, বিভিন্ন ঐতিহাসিকের উক্তি বাংলার শাসকদের বিভিন্ন স্থাপনা ও শিলালিপি, তাঁর নামে স্থানের নামকরন ও মুদ্রা প্রচলনই তা প্রমান করে। বাংলার ইতিহাসে এমন কোন শাসকের দরবার নেই যা হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রাঃ) এঁর দরবারের অনুগ্রহে অনুগৃহীত হতে চায়নি। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ কালেক্টর লিন্ডসের আত্মজীবনি থেকে সামান্য উল্লেখ করা হলো -
সিলেট পৌছার পর আমলারা আমাকে জানালেন যে, সিলেটের শাসনকর্তার প্রথম কর্তব্য হযরত শাহ্জালালের দরগায় যেয়ে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। ভারতবর্ষে দুর-দুরান্ত হতে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা এই দরগায় জিয়ারত করতে আসেন। আমি প্রচলিত প্রথা মোতাবেক জুতা বাহিরে রেখে দরগায় যেয়ে পাঁচটি মোহর নজরানা দিলাম। এরূপে অভিসিক্ত হয়ে আমি প্রজাদের আনুগত্য গ্রহণ করলাম। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেখা গেছে যারা সিলেট -১ সংসদীয় আসনে (দরগা মহল্লায় ) বিজয়ী হয় তারাই সরকার গঠন করে এবং বর্তমান পর্যন্ত এটা বাস্তব বলে প্রমানিত হয়েছে।
এদেশের রাজনৈতিক শাসক যারাই হোকনা কেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর জনগনের হৃদয়ের মনিকোঠায় শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে সমাসীন হযরত শাহ্জালাল (রাঃ) এতদঞ্চলের মুকুটহীন সম্রাট। আর এ কারণেই সিলেটকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী ও পূণ্যভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
ইন্তেকাল
৭৪৬ হিজরি সনের ১৯শে জিলক্বদ হযরত শাহ্জালাল (রাঃ) ১৫০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তিঘটে। ইবনে বতুতা বর্ণনাকরেন, বুরহানউদ্দীন সাগরজী আমাকে বলেন ,হযরত শাহ্জালাল (রাঃ) ওফাতের একদিন পূর্বে তাঁর মুরিদগণকে ডেকে এ উপদেশ দিলেন যে , তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে, আল্লাহ্কে ভয় করবে। আল্লাহর হুকুমে কাল আমি তোমাদের নিকট হতে বিদায় নিব। পরের দিন যোহরের নামাজের শেষ সিজদার অবস্থায় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। আল্লাহপাক তাঁর বন্ধুকে তাঁর কাছে টানিয়া নিলেন। হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রাঃ) এঁর হুজরার পাশে অলৌকিক ভাবে একটি কবর খোদিত অবস্থায় পাওয়া যায়। উক্ত কবরে কাফন ও খুশবো-আতর মওজুদ ছিল। তাঁহার মুরিদগণ হযরতকে কাফন পড়াইয়া জানাজার নামাজ পড়িয়া দাফন করিলেন। আল্লাহ তাঁহার পূত-পবিত্র আত্মার শান্তি বিধান করুন।
উল্লেখ্য হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রাঃ) এঁর হুজরার পাশে মুর্শীদ প্রদত্ত মক্কার মাটি তাঁর নির্দেশে যেখানে প্রোথিত করা হয়েছিল সেখানেই কবরটি খোদিত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রতি বছর হিজরী সনের ১৯ ও ২০শে জিলক্বদ ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। ভেদাভেদ ভুলেগিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লোকজন সুলতানুল বাংলা, প্রাচ্যের সূর্য হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রাঃ) এঁর ওরস শরীফে হাজির হয়ে অপার্থিব প্রশান্তি লাভ করে। (সংগৃহীত পোস্ট)